বাংলা হান্ট ডেস্ক: মাত্র ৪০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। ফ্যাশন জগতে কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, ছিল না বড় কোনও প্রতিষ্ঠানের সাহায্য। অথচ নিজের ভাবনা, কাশ্মীরি সংস্কৃতির প্রতি গভীর টান এবং নতুন কিছু করার জেদকে সম্বল করেই আজ সফল (Success Story) পোশাকের ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছেন শ্রীনগরের (Srinagar) ইকরা আহমেদ (Iqra Ahmad)। ২০১৫ সালে তাঁর হাত ধরে পথচলা শুরু করে ‘তুল পালাভ’। ইনস্টাগ্রামে নিজের তৈরি পোশাকের ছবি দিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ পৌঁছে গিয়েছে তারকাদের অন্দরমহলেও। দিলজিৎ দোসাঞ্জ, বিদ্যা বালান, হুমা কোরেশি, হিনা খান এবং সোনম বাজওয়ার মতো পরিচিত মুখ এই ব্র্যান্ডের পোশাক পরেছেন। ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি নকশা ও আধুনিক ফ্যাশনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ইকরা প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন পূরণ করতে সব সময় বিপুল পুঁজির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় নিজের ভাবনার উপর আস্থা এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস।
ইকরা আহমেদের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
ইকরার বেড়ে ওঠা আইনজীবী ও চিকিৎসকদের পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ থাকলেও, স্থানীয় স্তরে উপযুক্ত সুযোগের অভাবে তিনি ভাষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু পড়াশোনার বিষয় তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অন্যের অধীনে কাজ করার বদলে নিজের পরিচিতি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০১৫ সালে এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁর উপর আস্থা রেখে এক লক্ষ টাকা উপহার দেন। সেই অর্থ থেকে ৪০ হাজার টাকা কাজে লাগিয়ে বাড়িতেই তৈরি করেন সাধারণ ও পছন্দমতো নকশার ফেরানের প্রথম সম্ভার। মোবাইলে পোশাকগুলির ছবি তুলে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করতেই অভাবনীয় সাড়া মেলে। মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায় সমস্ত পোশাক। সেই সাফল্যই ইকরাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাঁর ভাবনার জন্য ক্রেতা রয়েছেন, প্রয়োজন শুধু সেই ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া (Success Story)।
আরও পড়ুন: ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’! ল্যান্ডফলের আগে বাংলার আবহাওয়া নিয়ে বড় সতর্কতা
ইকরার সৃষ্টির মূল অনুপ্রেরণা তাঁর নিজের সংস্কৃতি। বাড়িতে দাদি ও মায়ের পুরনো পোশাক দেখতে দেখতেই কাশ্মীরি পোশাকের ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা তৈরি হয়। তিনি লক্ষ করেছিলেন, তাঁর প্রজন্মের অনেকেই ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি পোশাক পরতে ততটা আগ্রহী নন। সেই দূরত্ব ঘোচাতেই তিনি পুরনো কারুশিল্পকে আধুনিক নকশায় নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তুল পালাভের পোশাকে কাশ্মীরি তিল্লা ও আরি সূচিকর্মের পাশাপাশি পশমিনার মতো ঐতিহ্যবাহী উপাদানকে সমসাময়িক শৈলীর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। নিজের কাজের দক্ষতা আরও বাড়াতে ২০১৭ সালে দিল্লির ডব্লিউএলসিআই স্কুল অফ ফ্যাশনে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেন ইকরা। পরবর্তী সময়ে ল্যাকমে ফ্যাশন উইক এবং ফেমিনা মিস ইন্ডিয়ার মতো মঞ্চে কাজের সূত্রে তাঁর পরিচিতি বাড়ে। ধীরে ধীরে কাশ্মীরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ফ্যাশনপ্রেমীদের নজর কাড়ে তাঁর ব্র্যান্ড।
২০২০ সালে বিয়ের পর স্বামী রামিজ মালিকের সঙ্গে শিকাগোয় চলে যান ইকরা। রামিজ পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বিদেশে চলে যাওয়ার ফলে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও, সেই সময়ে ইকরার পাশে দাঁড়ান তাঁর স্বামী। কোভিড অতিমারির সময় দূর থেকে কাজ করার সুযোগ তৈরি হলে তাঁরা কাশ্মীরে ফিরে আসেন। পরে রামিজ নিজের তথ্যপ্রযুক্তির চাকরি ছেড়ে তুল পালাভের ব্যবসায় পুরোপুরি যুক্ত হন। ব্যবসা পরিচালনা ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাঁর সহযোগিতায় ব্র্যান্ডের পরিধি আরও বাড়ে। শ্রীনগরে নিজেদের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খোলার পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছনোর নতুন পথও তৈরি হয়। ফলে ইকরার ব্যক্তিগত স্বপ্ন ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর উদ্যোগের রূপ নিতে শুরু করে, যেখানে কাশ্মীরি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় আধুনিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা।

আরও পড়ুন: প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামলে ভারতের কাছে ৩৭০ কোটির বিদ্যুৎ বিক্রি নেপালের! বাংলাদেশেও শুরু সরবরাহ
বর্তমানে তুল পালাভের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি স্থানীয় কারিগর। ব্র্যান্ডটির মূল পরিচালন দলেও রয়েছেন মহিলারা। প্রতি মাসে ২০০-র বেশি গ্রাহককে পরিষেবা দেওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের পরিচিত মুখদের কাছেও পৌঁছে গিয়েছে এই উদ্যোগ। তবে ইকরার লক্ষ্য শুধু ব্যবসার পরিধি বাড়ানো নয়, কাশ্মীরের কারুশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এবং স্থানীয় শিল্পীদের কাজের সুযোগ তৈরি করাও। সেই ভাবনা থেকেই ‘মাতামাল প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে পুরনো পোশাককে নতুন রূপ দিয়ে টেকসই ফ্যাশনকে উৎসাহিত করছেন তিনি। ফেলে দেওয়ার বদলে পুরনো পোশাককে নতুনভাবে ব্যবহারের এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের গুরুত্বও তুলে ধরে। সামান্য পুঁজি থেকে শুরু করে তারকাদের পছন্দের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার ইকরার যাত্রা তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয় (Success Story); নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে কীভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, তারও এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।














