Durga Puja 2026 Live Updates

সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার রোধে বড় পদক্ষেপ! GPS ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট চালুর পরিকল্পনা জানালেন পরিবহণমন্ত্রী

Published on:

Published on:

Arjun Singh announces to start GPS and fleet management to stop misuse of Government car
Follow

ঈশানী মল্লিকঃ সরকারি আধিকারিকদের দাপ্তরিক কাজের জন্য বরাদ্দ থাকে সরকারি গাড়ি (Government Car)। তবে সেই গাড়িই দেদার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ। অফিসের পর, ছুটির দিনে বা পুজোর মরসুমে সরকারি গাড়িতে ব্যক্তিগত ভ্রমণ, জ্বালানির খরচ এবং চালকদের উপর চাপের অভিযোগ ঘিরে সরকারি সম্পদের ব্যবহার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh) জানান, এই নিয়ে তাঁদের দফতরেও অভিযোগ এসেছে। সেই সমস্যা সমাধানে জিপিএস ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার রোধে কড়াকড়ি রাজ্যের | (Arjun Singh)

সরকারি কাজের সুবিধার্থে ব্যবহারের জন্য সরকারি গাড়ি বরাদ্দ করা হয়। এটি কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সেই গাড়িতে আধিকারিকের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শপিং মল, মেলা, পুজোর অনুষ্ঠান, ঘরোয়া গেট টুগেদার বা অন্য কোনও ব্যক্তিগত গন্তব্যে যাতায়াত করা হলে তার খরচ কে বহন করছেন? জ্বালানি যদি সরকারি টাকায় কেনা হয়, চালকের বেতন যদি সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যক্তিগত সুবিধার মূল্যও কি শেষ অবধি জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে না? দেখা দিয়েছে এই প্রশ্ন।

আরও পড়ুনঃ আয়ুষ্মান ভারত যোজনা ও মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত! পুজোর মধ্যেই জারি বিজ্ঞপ্তি

যদিও এই প্রশ্ন কোনও ব্যক্তিবিশেষকে লক্ষ্য করে নয়। এটি সরকারি সম্পদের ব্যবহার, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। সরকারি বিধিতেও এই নিয়ে স্পষ্ট করে বেশ কিছু জানানো হয়েছে।

২০১৪ সালের ১৯ জুন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহণ দফতরের Notification No. 2516-WT/3M-98/2006 -এ লাল বা নীল বাতিযুক্ত ভাড়ার গাড়ির ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। বিজ্ঞপ্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই ধরনের গাড়ি কেবল সরকারি কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিককেই সেই গাড়ি ব্যবহার করতে হবে। অফিসের সময়ের পরে অ-দাপ্তরিক কাজে ওই গাড়ির ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

একই বিজ্ঞপ্তির ৫ নম্বর ধারায় সংশ্লিষ্ট নির্দেশ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা বা prosecution-এর কথাও রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই নিষেধাজ্ঞাটি নির্দিষ্ট ধরনের লাল বা নীল বাতিযুক্ত ভাড়ার গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একে সব সরকারি গাড়ির ক্ষেত্রে একই ভাষায় প্রযোজ্য বলে দাবি করা যায় না। অন্য গাড়ির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের শর্ত এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশও পরীক্ষা করতে হবে।

২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজ্য সরকারের Finance Department-এর অডিট শাখার গ্রুপ টি থেকে জারি করা Memo No. 560-F(Y), dated 15.02.2022 সরকারি দফতরগুলিতে মাসিক বা সাময়িক ভিত্তিতে ভাড়া করা গাড়ির ব্যবহারের আর্থিক দিকটি স্পষ্ট করে। এই মেমোয় বলা হয়েছে, শনিবার, রবিবার বা ঘোষিত ছুটির দিনে গাড়ি বাস্তবে ব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রধানকে সেই ব্যবহার প্রত্যয়িত করতে হবে।

অন্যদিকে, গাড়ি ব্যবহার না করে শুধু সম্ভাব্য প্রয়োজনের জন্য stand-by হিসেবে রাখা হলে, নির্দিষ্ট শর্তে লগবুকে দেওয়া স্ট্যান্ড-বাই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে দৈনিক ভাড়ার টাকা দেওয়া যেতে পারে। গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে এই নির্দেশ কার্যকর হয়েছে।

এই নির্দেশের তাৎপর্য হল, ছুটির দিনে গাড়ির ব্যবহার এবং গাড়ি স্ট্যান্ড-বাই রাখা— দু’টি আলাদা বিষয়। সরকারি গাড়ির বিল, লগবুক এবং সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেশনের যথার্থতা তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই মেমো নিজে থেকে প্রত্যেক আধিকারিকের ব্যক্তিগত ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে না। এটি মূলত মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া করা গাড়ির বিল ও স্ট্যান্ড-বাই চার্জ সংক্রান্ত নির্দেশ।

IAS, IPS এবং অন্যান্য প্রযোজ্য All India Services-এর সদস্যদের ক্ষেত্রে ১৯৬৮ সালের সংশোধিত Conduct Rules-এর Rule 3(2B)-তে সরকারি সম্পদের দক্ষ, কার্যকর ও মিতব্যয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি পদ ব্যবহার করে নিজের, পরিবারের বা বন্ধুদের আর্থিক কিংবা বস্তুগত সুবিধা আদায় না করার নীতিও উল্লেখ রয়েছে। কেন্দ্রের Press Information Bureau-র ৮ আগস্ট ২০১৪-এর বিজ্ঞপ্তিতে এই সংশোধনের বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

এই নীতিগুলি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং সরকারি পদ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সার্ভিস, গাড়ির বরাদ্দের শর্ত এবং প্রমাণ বিচার করেই বিধিভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এছাড়া বিতর্কের আরেকটি গুরুতর দিক হল সরকারি গাড়ির চালকদের কর্মপরিবেশ। অভিযোগ, কোনও কোনও ক্ষেত্রে অফিসের কাজের বাইরে আধিকারিকের ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও চালকদের গাড়ি চালাতে বলা হয়। কখনও ছুটির দিনে, কখনও আবার অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরে। চালক অতিরিক্ত কাজের জন্য টাকা চাইলে তাঁকে ধমক দেওয়া বা চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠতে পারে। এই অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু গাড়ির অপব্যবহারের প্রশ্ন নয়, এটি কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কর্মীর প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নও।

রাজ্য সরকারের ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জারি করা Finance Department-এর Memo No. 650-F(P1) -এ সরকারি গাড়ির সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী চালক, ক্লিনার, হেল্পার ও খালাসিদের বিশেষ ভাতা বা দৈনিক ভাতা সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। রবিবার ও ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই অনুযায়ী, চালকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও ছুটির দিনের কাজের বিষয়টি সরকারি বিধির বাইরে নয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট চালক কোন হারে বা কোন শর্তে ভাতা পাবেন, তা তাঁর নিয়োগের ধরন, প্রযোজ্য আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের নিয়ম দেখে স্থির করতে হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, কোনও আধিকারিক ব্যক্তিগত কাজে চালককে ব্যবহার করে থাকলে সেই যাত্রা সরকারি দায়িত্বের অংশ কিনা, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। ব্যক্তিগত কাজকে সরকারি ডিউটি হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত ভাতা দাবি করা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, তেমনই প্রকৃত সরকারি দায়িত্ব পালন করেও চালক প্রাপ্য ভাতা থেকে বঞ্চিত হলে তারও তদন্ত প্রয়োজন।

এই বিষয়গুলির পাশাপাশি একটি সরকারি গাড়ির সঙ্গে জ্বালানি, চালকের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতি ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গাড়ি ভাড়া সহ একাধিক খরচও যুক্ত থাকে। ফলে সরকারি গাড়িতে ব্যক্তিগত যাতায়াতের অভিযোগ উঠলে শুধু গাড়িটি কোথায় গিয়েছিল, তা জানলেই হবে না। সেই যাত্রার উদ্দেশ্য, লগবুকের এন্ট্রি, জ্বালানির বিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাবও পরীক্ষা করা উচিত।

পুজোর সময় বা অন্য ছুটিতে কোনও আধিকারিক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাড়িতে ঘুরেছেন— এমন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাওয়া যেতে পারে। যেমন- ​গাড়িটি কি সরকারি মালিকানাধীন নাকি সরকারি অর্থে ভাড়া করা? গাড়ির বরাদ্দপত্রে ব্যক্তিগত ব্যবহারের অনুমতি আছে? ​সংশ্লিষ্ট যাত্রার জন্য কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল? লগবুকে যাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও গন্তব্য লেখা হয়েছে? সরকারি জ্বালানি ব্যবহার করা হলে তার হিসাব কী? ​ব্যক্তিগত ব্যবহার অনুমোদিত হলে তার জন্য নির্ধারিত হারে অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে? চালককে ছুটির দিনে বা নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করানো হলে সেই কাজের অনুমোদন ও প্রাপ্য ভাতার হিসাব রয়েছে?

নথির ভিত্তিতে এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা অনেক সহজ হবে। এক্ষেত্রে Finance Department ও Labour Department-এর ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। সরকারি গাড়ির বরাদ্দ, জ্বালানি ব্যয়, ভাড়া, লগবুক এবং সরকারি অর্থের হিসাবের ক্ষেত্রে Finance Department ও Transport Department-এর প্রাসঙ্গিক আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, চালকের নিয়োগের ধরন অনুযায়ী তাঁর কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক ও চাকরির শর্ত পরীক্ষা করতে হবে।

তবে সরকারি আধিকারিকদের পরিবারের ব্যক্তিগত ভ্রমণে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে Labour Department-এর কোনও নির্দিষ্ট, সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ এখানে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সেই দফতরের নামে কোনও অপ্রমাণিত আদেশ উদ্ধৃত করা সমীচীন নয়।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, সরকারি গাড়ি কোনও ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জিনিস নয়। সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও তার মানে এই নয় যে সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত সুবিধার অবাধ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। আবার কোনও আধিকারিকের পরিবার গাড়িতে উঠেছেন বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিধিভঙ্গ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। গাড়ির বরাদ্দের শর্ত, সংশ্লিষ্ট পদে প্রযোজ্য নিয়ম, অনুমোদন ও ব্যয়ের হিসাব— সবই পরীক্ষা করতে হবে।

যদি প্রমাণিত হয়, সরকারি কাজে বরাদ্দ গাড়ি ব্যক্তিগত বেড়ানো, শপিং মল, মেলা বা পারিবারিক ভ্রমণে ব্যবহার করা হয়েছে ও সেই খরচ অননুমোদিতভাবে সরকারি কোষাগার থেকে বহন করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। একইভাবে চালকদের ভয় দেখিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজ করানোর অভিযোগেরও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার।

Arjun Singh

সরকারি কর্মচারীদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা শুধু নিয়ম মেনে অফিস করা নয়, জনগণের প্রতিটি টাকার ব্যবহারেও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। সরকারি গাড়ির চাকা যদি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ঘোরে, তবে তার জ্বালানির হিসাবও জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া উচিত।

এই বিষয়ে রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী অর্জুন সিং বলেন, “গাড়ি বা যে কোনও জিনিস ভালো কাজে ব্যবহার করার জন্য। কোনও কিছুর অপব্যবহার ঠিক নয়। অফিস যাতায়াত, অফিসিয়াল পারপাসের সময় যদি দেখা যায়, সেই নির্দিষ্ট রাস্তায় তাঁর অন্য একটা কাজ সেই সময় রয়েছে, এই সামান্য বিষয়গুলিতে অনুমতি দেওয়া যায়। কিন্তু গাড়ি আছে মানেই যে কোনও প্রয়োজনে ব্যবহার করলাম, উৎসব, অনুষ্ঠানে সরকারি গাড়ি নিয়ে গেলাম, লোকের কাছে মান বাড়ালাম, এগুলো ঠিক নয়। আমাদের দফতরেও এই রকম অভিযোগ এসেছে। আমরা পরিকল্পনা করেছি, জিপিএস (GPS) ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট চালু করব।”