বাংলাহান্ট ডেস্ক: সাইবার হামলার (Cyber Attack) নিশানায় এ বার হাসপাতাল বা ব্যাঙ্ক নয়, সরাসরি রক্ত সংরক্ষণের (Blood Bank) পরিকাঠামো! ফ্রান্সের (France) জাতীয় রক্ত সরবরাহকারী সংস্থার কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থায় হানা দিয়ে রক্তের প্লাজমা নষ্ট করার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে হ্যাকারদের বিরুদ্ধে। সংরক্ষিত প্লাজমার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে সেটিংস বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ, হিমঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের নির্ধারিত মান রাতারাতি বাড়িয়ে ১১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে দেওয়া হয়েছিল। সাধারণত মাইনাস ২৫ থেকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্লাজমা সংরক্ষণ করা হয়। ফলে এই ধরনের কারসাজি সফল হলে বিপুল পরিমাণ রক্তের উপাদান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের স্বাস্থ্য পরিষেবায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
এবার ফ্রান্সে (France) ব্লাড ব্যাঙ্কে সাইবার অপরাধীদের হামলা
ঘটনাটি ঘটেছে গত ১ ও ২ নভেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ফ্রান্সের (France) জাতীয় রক্ত সংস্থা (ইএফএস)-এর শীতলীকরণ পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা কুলওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাকে নিশানা করেছিল হ্যাকাররা। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লে কানার আঁশেনে’-র প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে এই সাইবার হামলার খবর প্রকাশ করেছে ‘সাইবারঅ্যাটাক’। বুরগুন্দি-ফ্রঁশ-কঁতে অঞ্চলের একাধিক রক্ত সংরক্ষণ কেন্দ্রে এই হামলার প্রভাব পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, রক্তদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা এবং সেগুলির নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত সংরক্ষণ ব্যবস্থাই আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু পরে ইএফএসের তরফে জানানো হয়, রোগীদের শরীরে রক্ত সঞ্চালনের কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা প্লাজমাও এই ঘটনার আওতায় ছিল।
আরও পড়ুন: অগ্নিবীরদের জন্য বড় ঘোষণা! চাকরির মেয়াদের পাশাপাশি বাড়ল বেতনও
তবে বড়সড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে কর্মীদের তৎপরতায়। রাতের দায়িত্বে থাকা এক প্রযুক্তিবিদ কোল্ড স্টোরেজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরেই তিনি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সতর্ক করেন। এরপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দাবি, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় রক্ত সংরক্ষণ ও সরবরাহ পরিষেবায় কোনও বিঘ্ন ঘটেনি। এখনও পর্যন্ত কোনও প্লাজমা নষ্ট হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা কোনও রোগীর শারীরিক ক্ষতির ঘটনাও সামনে আসেনি। ফলে আপাতত স্বস্তিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
তবে এই ঘটনায় ১১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উল্লেখ নিয়ে বিশেষ ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি সংরক্ষিত প্লাজমার তাপমাত্রা এতটা বেড়ে গিয়েছিল? প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, ১১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রের সেটিংসে নির্ধারিত একটি মান। হিমঘরের ভিতরের প্রকৃত তাপমাত্রা কিংবা সেখানে রাখা প্লাজমার তাপমাত্রা ১১০ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছেছিল, এমন কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি। ঠিক কতগুলি সংরক্ষণ ইউনিট আক্রান্ত হয়েছিল, কতক্ষণ ধরে এই কারসাজি চলেছিল এবং প্লাজমার উপর তার কোনও প্রভাব পড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত প্লাজমা নির্দিষ্ট হিমাঙ্কের নীচে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য তাপমাত্রার পরিবর্তনও তার গুণগত মান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন: কাজে এল না নগদ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি! মধ্যবর্তী নির্বাচনে লজ্জার হার ট্রাম্পের পার্টির
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই সাইবার হামলার পিছনে কারা রয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যেই বা এমন ঘটনা ঘটানো হল? এখনও পর্যন্ত হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা কুলওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থায় কীভাবে অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি। কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নিরাপত্তার দুর্বলতা নাকি পরিকল্পিত সাইবার আক্রমণ, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে ঘটনাটি আরও এক বার বুঝিয়ে দিল, সাইবার অপরাধীদের নিশানা এখন আর শুধু ব্যাঙ্কের তথ্য, সরকারি নথি কিংবা আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ নেই। হাসপাতাল, ব্লাড ব্যাঙ্ক এবং চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা পরিষেবার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তার পাশাপাশি বিকল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। ফ্রান্সের (France) এই ঘটনায় শেষ মুহূর্তে বিপদ এড়ানো গেলেও ভবিষ্যতে এমন হামলা আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।












