বাংলাহান্ট ডেস্ক: পৃথিবীকে আমরা যে মানচিত্রে এতদিন দেখে এসেছি, তার চেহারাই এবার বদলে যেতে পারে। প্রায় পাঁচ শতক ধরে প্রচলিত মানচিত্রের জায়গায় ‘ইকুয়াল আর্থ’ (Equal Earth) নামে নতুন একটি বিশ্বমানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের (United Nations) সাধারণ সভা। শনিবারের ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দিয়েছে। বিপক্ষে ছিল আমেরিকা (America)। আরও ছ’টি দেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। নতুন এই মানচিত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের আয়তন বাস্তবের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা আগের তুলনায় অনেক বেশি বড় করে দেখা যাবে। অন্যদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আয়তন তুলনামূলক ভাবে ছোট মনে হবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের (United Nations) সাধারণ সভায় পাশ হল ‘ইকুয়াল আর্থ’
নতুন মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাবটি রাষ্ট্রপুঞ্জে (United Nations) তুলে ধরার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ টোগো। দেশটির বিদেশমন্ত্রী রবার্ট ডুসির নেতৃত্বে এই উদ্যোগ সামনে আসে। ভোটাভুটির পর আফ্রিকার একাধিক দেশ এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তবে প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচের বক্তব্য, ষোড়শ শতকের একটি মানচিত্র নিয়ে এত বিতর্ক না করে বর্তমান বিশ্বের বাস্তব সমস্যাগুলির দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত। যদিও সমালোচনা থাকলেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাবটি পাশ হওয়ায় বিশ্বমানচিত্রের দীর্ঘদিনের প্রচলিত কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন:ভয়াবহ ভূমিধসে অবরুদ্ধ নদীর গতিপথ! ফের হড়পা বানের আশঙ্কা নেপালে
বর্তমানে স্কুল, কলেজ, অফিস থেকে শুরু করে নানা ধরনের ভৌগলিক কাজে যে বিশ্বমানচিত্র দেখা যায়, তার ভিত্তি মূলত ‘মার্কেটর প্রোজেকশন’। ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ কার্টোগ্রাফার জেরার্ডাস মার্কেটর এই মানচিত্র তৈরির পদ্ধতি সামনে আনেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলকে সহজ করা। পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু তাকে যখন সমতল কাগজে দেখানো হয়, তখন কিছু না কিছু বিকৃতি হওয়াই স্বাভাবিক। মার্কেটর প্রোজেকশনের ক্ষেত্রে নিরক্ষরেখা থেকে যত মেরুর দিকে যাওয়া হয়, ততই স্থলভাগের আকার বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে উত্তর গোলার্ধের অনেক দেশ ও অঞ্চল বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি বিশাল বলে মনে হয়।
এই বিকৃতির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ড। প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে দু’টির আয়তন প্রায় কাছাকাছি বলে মনে হতে পারে। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়। অর্থাৎ মানচিত্রে কোনও জায়গার অবস্থান বা দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মার্কেটর প্রোজেকশন অত্যন্ত কার্যকর হলেও মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তন বোঝার ক্ষেত্রে তা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। নতুন ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্রের লক্ষ্যই হল এই সমস্যাটা অনেকটাই কমানো। এখানে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ওশেনিয়ার মতো অঞ্চলগুলিকে বাস্তব আয়তনের কাছাকাছি অনুপাতে দেখানো হয়েছে।

এই নতুন মানচিত্রের ভিত্তি ‘ইকুয়াল এরিয়া প্রোজেকশন’, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের আয়তনের পারস্পরিক অনুপাত যতটা সম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করা হয়। ২০১৮ সালে একদল কার্টোগ্রাফার এই পদ্ধতির ভিত্তিতে ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। এরপর থেকেই আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তন আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরার জন্য এই মানচিত্র ব্যবহারের দাবি জোরালো হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জে (United Nations) প্রস্তাব পাশ হওয়ার ফলে সেই উদ্যোগ এবার আরও বড় স্বীকৃতি পেল। তবে এর অর্থ এই নয় যে আগামী দিনেই বিশ্বের সব স্কুল, অফিস বা সরকারি নথিতে পুরনো মানচিত্র পুরোপুরি উঠে যাবে। বরং পৃথিবীকে দেখার ক্ষেত্রে একটি বিকল্প, আয়তন-নির্ভর মানচিত্র ব্যবহারের পথ আরও প্রশস্ত হল। ফলে পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা বিশ্বমানচিত্রের ধারণায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।













