বাংলা হান্ট ডেস্ক: সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমশ অগ্রগতি ঘটছে। যার ওপর ভর করে তৈরি হচ্ছে এমন কিছু অবিশ্বাস্য জিনিস যেগুলি আগামী দিনে মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেই রেশ বজায় রেখেই বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এমন একটি জেনারেটর (Hydrogel Generator) বা বলা ভালো একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা বাতাস থেকে আর্দ্রতা (যেমন- সিক্ত জল বা ঘাম) শোষণ করে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে। হ্যাঁ, প্রথমে এটি পড়ে অবাক হলেও এটা কিন্তু একদমই সত্যি। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, ওই যন্ত্র এতটাই নমনীয় যে হাজার হাজার বার বাঁকানো বা প্রসারিত করার পরেও অক্ষত থাকে। ভবিষ্যতে, এই প্রযুক্তি শরীরে পরিহিত মেডিকেল সেন্সর বা ফিটনেস ব্যান্ডগুলিকে চার্জার ছাড়াই, কেবল চারপাশের বাতাস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হতে সাহায্য করতে পারে। বর্তমান প্রতিবেদনে এই নতুন প্রযুক্তিটি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে তথ্য উপস্থাপিত করা হল।
তৈরি অভিনব জেনারেটর (Hydrogel Generator):
মূলত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিধানযোগ্য ডিভাইসগুলিতে আর ব্যাটারির প্রয়োজন হবে না। মূলত, পরিধানযোগ্য গ্যাজেটগুলির ক্ষেত্রে ব্যাটারি প্রায়শই বড় সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হয়। এগুলিকে ক্রমাগত চার্জ দেওয়াটা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটরের মতে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী বাতিল ফোন, কম্পিউটার এবং টেলিভিশনের মতো প্রায় ৬৮ মিলিয়ন টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়েছিল। রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে যে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৯০ মিলিয়ন টন হবে। যদিও, সেলফ পাওয়ার্ড সেন্সর এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান না করলেও এটি এমন একটি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে পারে যেখানে ছোট ডিভাইসগুলিতে কম ব্যাটারি বদলানোর প্রয়োজন হবে এবং কম ডিসপোজেবল হার্ডওয়্যার থাকবে।

বাষ্প থেকে শক্তি সংগ্রহ: এই ময়েশ্চার ইলেকট্রিক জেনারেটরটি তার চারপাশের বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প থেকে শক্তি সংগ্রহ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এর মানে হল, একটি নরম স্কিন প্যাচ, ফেস মাস্ক বা ছোট হেলথ মনিটর প্রচলিত ব্যাটারির ওপর নির্ভর না করে দৈনন্দিন আর্দ্রতা দিয়েই চালিত হতে পারে। বর্তমানে, সম্পূর্ণ প্রসারণযোগ্য হাইড্রোজেল ময়েশ্চার ইলেকট্রিক জেনারেটর প্রায়শই কম শক্তি উৎপাদন এবং যান্ত্রিক দুর্বলতায় ভোগে। কারণ হাইড্রোজেল এবং ইলেকট্রোড স্তরগুলি দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকে না। এই স্তরগুলি আলাদা হয়ে গেলে এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। পরিধানযোগ্য ডিভাইসগুলোর জন্য এটি একটি বড় সমস্যা। সেক্ষেত্রে কবজি, বুক বা মুখে লাগানো সেন্সরগুলি পরীক্ষাগারের নমুনার মতো স্থিতিশীল নয়। নড়াচড়ার সঙ্গে এগুলি বেঁকে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে প্রসারিত হয় এবং ঘাম, শুষ্ক ঘর, ঠান্ডা বাতাস ও তাপের সংস্পর্শে আসে।
নতুন প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে: নতুন ডিজাইনের মূল লক্ষ্য হল জেল (অর্থাৎ হাইড্রোজেল) এবং বৈদ্যুতিক তার (অর্থাৎ ইলেকট্রোড) কোথায় ও কীভাবে সংযুক্ত হবে! গবেষকরা একটি অত্যন্ত আঠালো হাইড্রোজেল ব্যবহার করেছেন. যা জল ও গ্লিসারলের মিশ্রণে ফুলে ওঠে, এবং তারপর সেটিকে তরল ধাতু ও প্রসারণযোগ্য রুপোর ইলেকট্রোডের সাথে যুক্ত করেছেন। এখানে মূল উপাদানটি হলো গ্লিসারল। রিপোর্ট অনুসারে, এটি হাইড্রোজেন বন্ধনকারী গ্রুপ বৃদ্ধি করে এবং ইলেকট্রোডের সঙ্গে আরও কার্যকর কন্টাক্ট পয়েন্ট তৈরি করে। এছাড়াও, আটকে থাকার ক্ষমতা ও ইন্টারফেসে রেজিস্ট্যান্স কমায়। এর ফলে ডিভাইসটি প্রসারিত বা বাঁকানো হলেও বিদ্যুৎ বা কারেন্ট অবাধে প্রবাহিত হতে পারে। বিজ্ঞানীর দল আরও দেখেছে যে, গ্লিসারল হাইড্রোজেলকে শুকিয়ে যাওয়া, জমাট বাঁধা এবং ফুলে ওঠা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: আর নেই সঙ্কট! LPG সরবরাহের ওপর থেকে উঠল সমস্ত নিষেধাজ্ঞা, বড় সিদ্ধান্ত সরকারের
৮৫ শতাংশ আর্দ্রতা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে: পরীক্ষার সময় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সেটি একটি ফোন চার্জারের তুলনায় কম। কিন্তু এই ধরণের সফট ইলেকট্রনিক্সের জন্য বেশ ভালো। যখন বাতাসে ৮৫ শতাংশ আর্দ্রতা ছিল, তখন এটি প্রায় ১ ভোল্ট (০.৯৪V) বিদ্যুৎ উৎপন্ন করেছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, এটি কোনও বাধা ছাড়াই ২২০ ঘন্টা বা ৯ দিনেরও বেশি সময় ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, এটিকে ৮,০০০ বার বাঁকানো এবং ৮০ শতাংশ প্রসারণে ১,০০০ বার টানার পরেও এটি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকতে পারে। রিলিজ নোটে আরও বলা হয়েছে যে, এটিকে সর্বোচ্চ ১,০৪০ বার ১৮০° কোণে বাঁকানো এবং ৮,০০০ বার টানার পরেও এটি কার্যকর থাকতে পারে।
আরও পড়ুন: ১২৬ বছর পর সবথেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প! ভেনেজুয়েলায় ১০,০০০ মৃত্যুর আশঙ্কা, সাহায্যের আশ্বাস ভারতের
কোথায় ব্যবহার করা হবে: এই গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে, এই প্রযুক্তির আসল উদ্দেশ্য হল পরিধানযোগ্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলিকে শক্তি প্রদান করা। পরীক্ষার সময়, ডিভাইসটি কোনও ধরণের অস্ত্রোপচার ছাড়াই সফলভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সেন্সর এবং ইসিজি মেশিনকে শক্তি জুগিয়েছে। এমতাবস্থায়, এটি স্বাস্থ্য পরিষেবা, খেলাধুলা পর্যবেক্ষণ, প্রবীণদের সেবা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে। তবে, ক্লিনিক বা সাধারণ ব্যবহারকারীদের পরিধানযোগ্য ডিভাইসে এটি ব্যবহারের আগে এর ব্যাপক প্রসার, নিরাপদ প্যাকেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষা প্রয়োজন।













