বাংলা হান্ট ডেস্ক: বিহারের মুঙ্গের জেলার জামালপুর ছোট একটি গ্রামের সাধারণ জীবনের ভাঁজে বড় হয়ে ওঠা গৌতম কুমার হয়তো কখনও ভাবেননি, তাঁর রান্না একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে আন্তর্জাতিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের টেবিলে পৌঁছবে এবং তাঁকে সাফল্যের (Success Story) চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যাবে। ছোটবেলায় প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যাওয়া সেই ছেলেটির মনে ছিল এক অদৃশ্য অযোগ্যতার বোধ। বিশেষ করে যখন তিনি রাঁধুনি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সমাজের চোখে সেটি ছিল অস্বাভাবিক পছন্দ—ছোট শহরের ছেলের জন্য তো বটেই, কারণ রান্নাকে তখনও অনেকেই শুধুই ‘মহিলাদের কাজ’ বলে মনে করতেন।
গৌতম কুমারের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
পেশাদার জগতে পা রাখার পর চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট হয়। বিহারের বাইরে বড় রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়ে উপভাষা, খাদ্যাভ্যাস ও পটভূমির কারণে তাঁকে ‘বিহারি’ পরিচয়ে বিচার করা হত। বিহারি খাবারকে অনেক সময়ই সহজ বা নিম্নমানের বলে দেখা হত। এই সামাজিক ধারণা ভাঙতে গৌতম প্রথমে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেন। পাঁচতারকা হোটেলের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে তিনি মহাদেশীয় রান্না, আন্তর্জাতিক প্লেটিং ও আধুনিক কৌশল রপ্ত করেন। শাংরি-লা, দ্য ইম্পেরিয়াল, গ্র্যান্ড হায়াত, রেডিসন ও মেফেয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ তাঁকে পেশাদার স্বীকৃতি দিলেও মনে এক অস্থিরতা থেকেই যায়—নিজের খাদ্যসংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার অস্বস্তি।
আরও পড়ুন: T20 বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে পাকিস্তানকে ঝটকা দিতে প্রস্তুত টিম ইন্ডিয়া! মিলল বড় আপডেট
এই অস্থিরতাই পরে তাঁর শক্তিতে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে গৌতম নিজের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকান। বাজরা বা মিলেট, ঐতিহ্যবাহী শস্য, সাত্ত্বিক রান্না, স্থানীয় শাকসবজি ও কম মশলার ব্যবহার তাঁর রান্নাঘরের পরিচয় হয়ে ওঠে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পুষ্টিগুণে ভরপুর ও পরিবেশবান্ধব এই খাদ্যঐতিহ্যকে কেন ‘দরিদ্রদের খাবার’ বলে অবমূল্যায়ন করা হবে? ২০২৩ সালে সল্ট ক্যাটারিং-এর পরিচালক সমীর এস. গোগিয়ার সঙ্গে মিলে তিনি কিউরেটেড আয়ুর্বেদিক মেনুর পরীক্ষায় নামেন। ঋতুভিত্তিক উপাদান, হজমের ভারসাম্য, A2 ঘি-র ব্যবহার ও মশলার সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা—প্রতিটি বিষয়েই ছিল সূক্ষ্ম পরিকল্পনা।
এই দর্শনের বড় মঞ্চ আসে ২০২৩ সালের দিল্লির যশোভূমিতে অনুষ্ঠিত G20 শীর্ষ সম্মেলনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের জন্য গৌতম পরিবেশন করেন বাজরা-ভিত্তিক বিশেষ মেনু। এটি শুধু পেশাগত সাফল্য নয়, ব্যক্তিগত জয়েরও মুহূর্ত ছিল। যে শস্য একসময় অবহেলিত ছিল, সেটিই আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে সম্মান পায়। পরে ২০২৫ সালে জয়পুরে আইফা রজতজয়ন্তীতেও তাঁদের মিলেট-নির্ভর গ্রামীণ ভারতীয় খাবার বিশ্বমঞ্চে প্রশংসা কুড়োয়। মুম্বাই ও উদয়পুরের একাধিক উচ্চপ্রোফাইল বিয়েতে তাঁদের সাত্ত্বিক ও আয়ুর্বেদিক স্টল আন্তর্জাতিক অতিথিদের নজর কেড়ে নেয়।

আরও পড়ুন:দিল্লি বিস্ফোরণে যুক্ত ছিল পাক জঙ্গি সংগঠন জইশ! রাষ্ট্রসঙ্ঘের রিপোর্টে ফাঁস পাকিস্তানের আসল ছবি
আজ শেফ গৌতম কুমার ভারতীয় রন্ধনশৈলীর এক নতুন মুখ, যিনি অন্ধভাবে ট্রেন্ড অনুসরণ না করে ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে মেলান। তাঁর বিশ্বাস, প্রকৃত বিলাসিতা আমদানিকৃত উপাদানে নয়, নিজের সংস্কৃতির প্রতি আস্থায়। একসময় ‘অতিরিক্ত বিহারি’ পরিচয়ে বিচ্ছিন্ন বোধ করা সেই তরুণ আজ গর্বের সঙ্গে নিজের পরিচয় বহন করেন। তাঁর প্রতিটি পদে ফুটে ওঠে সরলতা, পুষ্টি ও শিকড়ের শক্তি—যা প্রমাণ করে, সাফল্যের আসল স্বাদ লুকিয়ে থাকে নিজের মাটির গন্ধেই।












