বাংলাহান্ট ডেস্ক: দুই বছর আগে বাংলাদেশের (Bangladesh) রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নাটকীয় মোড় এসেছিল, তার বর্ষপূর্তির দিনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। দিল্লির (Delhi) ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের জেরে ক্ষমতা ছাড়ার পর বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দৃঢ় সুরে বলেন, তাঁকে জেলে পাঠানো হতে পারে, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হতে পারে, এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কাও রয়েছে, তবুও তিনি একদিন বাংলাদেশে ফিরবেন এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করবেন। তাঁর দাবি, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে আরও বেশি করে ফিরে যাওয়ার দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
কবে বাংলাদেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)? জানালেন দিল্লি থেকে
নিজের বক্তব্যে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, সেটি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত বা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। বরং সুপরিকল্পিতভাবে আন্দোলনকে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সরকার আলোচনার পথেই এগোতে চেয়েছিল। কোটা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং তিন জন মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনাতেও বসেছিলেন। কিন্তু এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তাঁর অভিযোগ, একটি সংগঠিত গোষ্ঠী আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগের দাবিকে সামনে আনে। হাসিনার কথায়, সে সময় দেশের বহু সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট হয়েছিল এবং ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, ১৯৭১ সালে যে আদর্শ ও আত্মত্যাগের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আরও পড়ুন: ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে অনাথ আশ্রমে পড়াশোনা! অভাবকে জয় করে IAS অফিসার হয়ে নজির আব্দুলের
বক্তৃতায় বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দেশের শিল্প উৎপাদন কমেছে, দারিদ্র্য বেড়েছে, ঋণখেলাপির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার মাসে কয়েকশো কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রশাসনিক ব্যয় মেটাচ্ছে। পাশাপাশি বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং অনেক ব্যবসায়ী দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলেও তাঁর অভিযোগ। ছাত্র আন্দোলনের সময় নিহতদের ঘটনার তদন্তের জন্য তাঁর সরকার ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে তাঁর অভিযোগ, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার সেই তদন্তের কাজ এগোতে দেয়নি। কেন সত্য প্রকাশ্যে আসতে দেওয়া হল না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শেখ হাসিনার সঙ্গে এদিন ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনিও বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, দেশে রাজনৈতিক কর্মীদের উপর হামলা, সংবাদমাধ্যমের উপর চাপ এবং মৌলবাদী সংগঠনগুলির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। তিনি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরার আবেদন জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক শাকিব আল হাসান-সহ আরও কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণতন্ত্রের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পায়। হাসিনা স্পষ্ট করে জানান, অতীতেও তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরেছিলেন। এবারও সেই সংকল্প অটুট রয়েছে বলেই তিনি দাবি করেন।

আরও পড়ুন: শিক্ষা-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে ভারতীয়দের অবদান! ১৫ অগাস্টকে ‘ইন্ডিয়া ডে’ ঘোষণা আমেরিকার অঙ্গরাজ্যের
এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও নানা ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ীর মতে, শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকাশ নয়, বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ধারণা, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার প্রশ্নে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে অবস্থানকারী কোনও বিদেশি রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য বক্তব্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি থাকা স্বাভাবিক। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে তিস্তা জলবণ্টন, সীমান্ত ইস্যু, চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে তাঁর সমস্ত অভিযোগ ও দাবি বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের অবস্থানের সঙ্গে মিলবে এমন নয়; বিষয়গুলি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও অব্যাহত।

















