বাংলাহান্ট ডেস্ক: গত কয়েক বছরে ভারতের (India) যোগাযোগ ব্যবস্থা এক অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা উন্নত, তা শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা, কতগুলি সেতু বা কত বড় রেললাইন (Indian Railways) তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সাধারণ মানুষের কাছে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যায় যাত্রাপথে—আগের তুলনায় কতটা সময় কম লাগছে, কতটা সহজ হচ্ছে গন্তব্যে পৌঁছনো। গত কয়েক বছরে সেতু, সুড়ঙ্গ, এক্সপ্রেসওয়ে এবং দ্রুতগতির রেল পরিষেবার সম্প্রসারণে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগের ধরন বদলেছে। নদী, পাহাড় কিংবা দীর্ঘ ঘুরপথের মতো প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বাধা পেরিয়ে নতুন সংযোগ তৈরি হওয়ায় বহু রুটে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সরকারি তথ্যেও এমন একাধিক প্রকল্পের উল্লেখ রয়েছে, যেগুলি দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহণকে আরও দ্রুত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
সেতু-টানেল-এক্সপ্রেসওয়ে কীভাবে বদলেছে ভারতের (India) যোগাযোগ ব্যবস্থা?
উত্তর-পূর্ব ভারতের (India) ছবিটাই ধরা যাক। ধোলা-সাদিয়া বা ভূপেন হাজারিকা সেতু অসম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের উপর বগিবিল সেতুও ডিব্রুগড় ও ধেমাজির মধ্যে যোগাযোগকে অনেক সহজ করেছে। বিহারের কোশি রেল মহাসেতু দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে নির্মলি ও সরাইগড়ের মধ্যে রেল যোগাযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আবার মহারাষ্ট্রের মুম্বই ট্রান্স হারবার লিঙ্ক বা অটল সেতু মুম্বই ও নবি মুম্বইয়ের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তৈরি করেছে। ফলে আগে যে যাত্রায় দীর্ঘ ঘুরপথ পেরোতে হত, নতুন পরিকাঠামো সেই পথকে অনেক বেশি সরাসরি করেছে। অরুণাচলের সিসেরি নদীর সেতুর মতো প্রকল্পও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী করেছে।
আরও পড়ুন: ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম জ্ঞানেশকে! ইস্তফা না দিলে দেশজুড়ে ‘যন্তর মন্তর ২’-র হুঁশিয়ারি ককরোচদের
শুধু নদী নয়, পাহাড়ও এখন আর আগের মতো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। অটল টানেল রোহতাং পাস এড়িয়ে মানালি ও লাহুল-স্পিতির মধ্যে সারা বছর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে এবং পথের দূরত্বও কমিয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় টানেল জম্মু-শ্রীনগর যাত্রাপথে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় বাঁচানোর সুবিধা দিয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানায়। অন্যদিকে বানিহাল-কাজিগুন্ডের টানেল ব্যবস্থাও পাহাড়ি রুটে দ্রুত ও তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ তৈরি করেছে। অরুণাচল প্রদেশের সেলা টানেলও তেজপুর-তাওয়াং রুটে সর্ব-মৌসুমি যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সুড়ঙ্গের মাধ্যমে পাহাড় কেটে শুধু রাস্তা ছোট করা নয়, আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সমস্যাও কমানোর চেষ্টা চলছে।
একই ছবি দেখা যাচ্ছে এক্সপ্রেসওয়ে ও অর্থনৈতিক করিডরগুলিতেও। দিল্লি-মিরাট এক্সপ্রেসওয়ে, বেঙ্গালুরু-মাইসোর এক্সপ্রেসওয়ে, মুম্বই-নাগপুর সমৃদ্ধি মহামার্গের মতো প্রকল্পগুলি দীর্ঘ সড়কযাত্রাকে দ্রুত করার জন্য তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে চালু হওয়া দিল্লি-দেহরাদুন ইকোনমিক করিডরও তার বড় উদাহরণ। ২১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অ্যাক্সেস-কন্ট্রোলড করিডর দিল্লি থেকে দেহরাদুনের যাত্রার সময় ছয় ঘণ্টার বেশি থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টায় নামিয়েছে বলে সরকারি তথ্য জানাচ্ছে। পাশাপাশি আহমেদাবাদ-ধোলেরা এক্সপ্রেসওয়ের মতো নতুন প্রকল্প আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহণের গতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: উৎসবের মরসুমে বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের! রান্নার তেলের আমদানি শুল্কে কাটছাঁট, কমবে দাম?
রেলপথেও একই পরিবর্তনের লক্ষ্য স্পষ্ট। বন্দে ভারত (India) পরিষেবা একাধিক শহরের মধ্যে তুলনামূলক দ্রুত যাত্রার সুযোগ তৈরি করেছে, আর ভবিষ্যতের হাই-স্পিড রেল আরও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল করিডরটি ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ; এর অপারেশনাল গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার এবং মুম্বই-আহমেদাবাদ যাত্রার সময় প্রায় ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম পরিষেবা ২০২৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে আরও সাতটি হাই-স্পিড রেল করিডর ঘোষিত হয়েছে, যেগুলির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন রাস্তা বা রেললাইন তৈরি নয়—মানুষের যাত্রাপথ থেকে সময় কমিয়ে আনা, দূরের অঞ্চলকে কাছে আনা এবং যোগাযোগের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা।













