বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত হল এক ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (India-EU Free Trade Deal), যাকে বিশ্বনেতাদের একাংশ “মাদার অফ অল ডিলস” বলে অভিহিত করছেন। নয়া দিল্লিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্ব যৌথভাবে এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেন। প্রায় দুই দশক ধরে চলা আলোচনার পর ভারত-ইইউ শীর্ষ বৈঠকেই এই সমঝোতা চূড়ান্ত হল, যা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি যৌথ বাজার তৈরি হচ্ছে, যা বিশ্বের মোট জিডিপির আনুমানিক ২৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
EU-র সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি (India-EU Free Trade Deal) কেমন প্রভাব ফেলবে ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে?
বাণিজ্য মন্ত্রকের আধিকারিকদের মতে, এই এফটিএর আওতায় পণ্য ও পরিষেবা মিলিয়ে ৯০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে। বর্তমানে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলার। নতুন চুক্তির ফলে এই অঙ্ক আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষত বস্ত্র, চামড়া, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রাংশ ও গয়না শিল্পের মতো শ্রমনির্ভর ক্ষেত্রগুলিতে রপ্তানির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
আরও পড়ুন:হোটেলের বারান্দা থেকেই তিস্তা আর হিমালয়! সিকিমের এই স্বল্প পরিচিত গ্রাম থেকে ঘুরে আসুন
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় বাজারে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, বস্ত্র ও যন্ত্রপাতি খাত সহজতর প্রবেশাধিকার পাবে। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রপ্তানি প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতদিন ইউরোপের বাজারে ভারতের পণ্যকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে, কারণ বহু স্বল্পোন্নত দেশ শুল্কমুক্ত সুবিধায় সেখানে প্রবেশাধিকার পেত। নতুন এফটিএ সেই অসুবিধা কাটিয়ে উঠতে ভারতীয় উৎপাদকদের বড় সুযোগ করে দেবে।
এই চুক্তি এমন এক সময়ে কার্যকর হল, যখন বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় শুল্কযুদ্ধ ও সুরক্ষাবাদী নীতির প্রবণতা বাড়ছে। আমেরিকার বাজারে শুল্কচাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে, এই এফটিএ ভারতের জন্য একটি অর্থনৈতিক ‘হেজ’ বা বিকল্প নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে আমেরিকার উপর নির্ভরতা কমবে এবং ভারতের সাপ্লাই চেইন আরও মজবুত হবে।

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গ পেল নতুন স্টপেজ, শতাব্দীসহ ১২ এক্সপ্রেস ট্রেন এবার কোথায় থামবে জানুন…
ঘরোয়া বাজারের দিক থেকেও এই চুক্তির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় গাড়ি, প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের মতো পণ্যের আমদানি তুলনামূলক সস্তা হতে পারে, যার ফলে ভোক্তারা লাভবান হবেন। তবে একই সঙ্গে ভারতীয় নির্মাতাদের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই চুক্তি ভারতকে ‘চায়না-প্লাস-ওয়ান’ বিকল্প হিসেবে ইউরোপের ঘনিষ্ঠ অংশীদার করে তুলছে এবং বৈশ্বিক সুরক্ষাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। প্রযুক্তি, পরিষ্কার জ্বালানি ও পরিষেবা খাতে গভীর সহযোগিতার পথ খুলে দিয়ে, এই এফটিএ ভারতকে দীর্ঘমেয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।












