বাংলাহান্ট ডেস্ক: প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বিশ্বের মানচিত্র বলতে যে ছবি মানুষের চোখে পরিচিত হয়ে উঠেছে, এবার সেই মানচিত্রের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবার পথে রাষ্ট্রসংঘ (United Nations)। তার আগেই কাশ্মীর-লাদাখ নিয়ে সতর্কবার্তা ভারতের (India)। পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তনকে তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরতে সমআয়তন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাব পাস হয়েছে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে। শুক্রবারের ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দেয়। বিপক্ষে ছিল একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত থাকে। তবে বিষয়টি এমন নয় যে রাষ্ট্রসংঘ মার্কেটর প্রোজেকশনকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে বা একটি নির্দিষ্ট নতুন মানচিত্রকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। বরং পৃথিবীর প্রকৃত আয়তন বোঝাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সমআয়তন মানচিত্র ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের মানচিত্র বদলের আবহে কাশ্মীর-লাদাখ নিয়ে রাষ্ট্রসংঘকে স্পষ্ট বার্তা ভারতের (India)
এই প্রস্তাবকে ঘিরে ভারতের (India) অবস্থানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নয়াদিল্লি প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে, দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কোনও ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য বরদাস্ত করা হবে না। বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখানোর বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রসংঘকে সতর্ক করেছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে ‘মানচিত্র সংশোধন: বৈশ্বিক মানচিত্রাঙ্কনগত উপস্থাপনার ভারসাম্য পুনঃস্থাপন এবং বিশ্বের অঞ্চলসমূহ, বিশেষত আফ্রিকার, ন্যায়সঙ্গত উপস্থাপনার প্রসার’ শীর্ষক প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে। ভারতের বক্তব্য, সমআয়তন মানচিত্র ব্যবহারের নীতিকে সমর্থন করা হলেও কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র বা প্রোজেকশনকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করছে না।
আরও পড়ুন: ক্যানিং পশ্চিমের তৃণমূল বিধায়কের বিরুদ্ধে টাকা হাতিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ! তদন্ত শুরু করল পুলিশ
বিশ্বের মানচিত্রে এই পরিবর্তনের আলোচনা মূলত মার্কেটর প্রোজেকশনের সীমাবদ্ধতাকে ঘিরে। ষোড়শ শতকে ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটর তৈরি করেছিলেন এই প্রোজেকশন। মূলত নৌ-পরিবহণ ও দিকনির্দেশের সুবিধার জন্য তৈরি হওয়ায় মানচিত্রটি নেভিগেশনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু পৃথিবী গোলাকার হওয়ায় সেটিকে সমতল কাগজে তুলে ধরতে গিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনে বিকৃতি তৈরি হয়। বিশেষ করে নিরক্ষরেখা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, মানচিত্রে সেই অঞ্চলগুলি বাস্তবের তুলনায় বড় দেখাতে থাকে। ফলে গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকাকে প্রায় কাছাকাছি আকারের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ। এই পার্থক্যই দীর্ঘদিন ধরে মার্কেটর মানচিত্রের সমালোচনার অন্যতম কারণ।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবে সমআয়তন বা equal-area প্রোজেকশনের ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের মানচিত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আপেক্ষিক আয়তন তুলনামূলকভাবে বাস্তবের কাছাকাছি থাকে। বিশেষ করে আফ্রিকার মতো বিশাল মহাদেশের প্রকৃত আয়তন মানচিত্রে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়। তবে রাষ্ট্রসংঘের গৃহীত প্রস্তাব কোনও নির্দিষ্ট ‘নতুন বিশ্বমানচিত্র’কে সরকারি মানচিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত, বিতর্কিত ভূখণ্ড কিংবা বিভিন্ন স্থানের নাম নিয়েও এতে কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বরং সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ‘Equal Earth’-সহ বিভিন্ন সমআয়তন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গোলাকার পৃথিবীকে সমতল মানচিত্রে দেখানোর অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করার কথাও বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: লিভ ইন সঙ্গীকে খুনের অভিযোগ! ঘটনার পুনর্নির্মাণে গিয়ে অভিযুক্তকে বেঁধে মার পুলিশের, ভাইরাল ভিডিও
রাষ্ট্রসংঘের এই উদ্যোগের পেছনে আফ্রিকার নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের একটি প্রচারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, প্রচলিত মানচিত্রে মহাদেশটির প্রকৃত আয়তন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। নতুন প্রস্তাব সেই আলোচনাকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ভারতের কাছে বিষয়টির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার সঠিক উপস্থাপনা। রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ড, যার মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখও রয়েছে, ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই চিত্রায়িত করতে হবে। কোনও ভুল বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ বিশ্বমানচিত্রে প্রোজেকশনের পরিবর্তন নিয়ে ভারত (India) ইতিবাচক হলেও, দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নয়াদিল্লির অবস্থান যে আগের মতোই কঠোর, রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে সেটিও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।













