বাংলাহান্ট ডেস্ক: একসময় ভারতের (India) প্রতিরক্ষা রপ্তানি মূলত ছোট অস্ত্র, যন্ত্রাংশ বা তুলনামূলক কম জটিল সরঞ্জামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেই ছবি এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ব্রহ্মোস (BrahMos) ও আকাশের (Akash) মতো ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিদেশি ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। ফলে শুধু দেশের সামরিক প্রয়োজন মেটানো নয়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভারত ধীরে ধীরে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। শুধু ব্রহ্মোস রপ্তানি থেকেই ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ভারতের (India) মিসাইলের দাপট, হবে ৬০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি রফতানি
ব্রহ্মোস ইতিমধ্যেই ভারতের (India) প্রতিরক্ষা রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে উঠেছে। ফিলিপাইনের সঙ্গে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় সরবরাহও শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে খবর। এই চুক্তিগুলি বাস্তবায়িত হলে ব্রহ্মোসের বিদেশে বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। উচ্চ গতি, নির্ভুলতা এবং দীর্ঘপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতার কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শুধু স্থল বা সমুদ্রভিত্তিক ব্যবস্থাই নয়, ব্রহ্মোসের বায়ু থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য সংস্করণও রয়েছে, যা সুখোই-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমানে ব্যবহার করা হয়। ফলে বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে এর ব্যবহারিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আরও পড়ুন: ফসল বাঁচাতে নির্মমতা? বন্দুকের গুলিতে মৃত্যু ২২ টি বাঁদরের, তদন্ত শুরু বন দফতরের
শুধু ব্রহ্মোস নয়, ভারতের আকাশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। ডিআরডিও-র প্রযুক্তির ভিত্তিতে তৈরি এই সিস্টেমের উৎপাদনের সঙ্গে ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড এবং ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের মতো ভারতীয় সংস্থা যুক্ত রয়েছে। দ্রুতগতির বিমান এবং অন্যান্য আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলার জন্য তৈরি আকাশের প্রাথমিক সংস্করণের পাল্লা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার বলে জানা যায়। আরও উন্নত আকাশ-এনজি সংস্করণের পাল্লা প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আকাশ ইতিমধ্যেই ভারতের প্রথম বিদেশি গ্রাহক হিসেবে আর্মেনিয়ার কাছে পৌঁছেছে। পরবর্তীতে তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গেও রপ্তানি নিয়ে আগ্রহ বা চুক্তির খবর সামনে এসেছে। ফলে দেশীয়ভাবে তৈরি বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের সম্ভাবনা বাড়ছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানির সাফল্য আসলে ভারতের গোটা প্রতিরক্ষা শিল্পে তৈরি হওয়া পরিবর্তনেরই একটি অংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবর্ষের ২৩,৬২২ কোটি টাকার তুলনায় ৬২.৬৬ শতাংশ বেশি। বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা রপ্তানি হচ্ছে। আগামী দিনে এই রপ্তানির পরিমাণ ৫০,০০০ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও নিয়েছে কেন্দ্র। সেই লক্ষ্য পূরণে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলিকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আরও যুক্ত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ব্রহ্মোস ও আকাশের মতো ব্যবস্থার বিদেশি বাজারে প্রবেশ তাই ভারতের (India) প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের বিষয় নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি রাডার, গাইডেন্স সিস্টেম, প্রপালশন, কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতেও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপস্থিতিও বাড়ছে। ব্রহ্মোস এবং আকাশের মতো প্রযুক্তি যত বেশি দেশে পৌঁছবে, ততই ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং রপ্তানি ব্যবস্থার পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, ছোট অস্ত্র ও যন্ত্রাংশের রপ্তানিকারক দেশ থেকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তির সরবরাহকারী হিসেবে ভারতের পরিচয় গড়ে ওঠার পথে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে।













