বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ইতিহাসে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। ব্রহ্মোস (BrahMos) ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ২৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সামনে এল বড় ঘোষণা। ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ জানিয়েছেন, দুই দেশ যৌথভাবে হাইপারসনিক ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের একটি নতুন ও তুলনামূলক ছোট সংস্করণ তৈরির কাজ করছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণক্ষমতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে দ্রুত আঘাত হানা, শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা এবং বহুমুখী ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ভারত-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে ‘মিনি ব্রহ্মস’ (BrahMos):
দিল্লির বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, গত ২৫ বছরে ব্রহ্মোস (BrahMos) শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, ভারত-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারিত্বের অন্যতম সফল প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ২০১৭ সালের সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষার প্রসঙ্গ, যার মাধ্যমে ভারত স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন বাহিনীর জন্য সমন্বিত কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করে। আলিপভের মতে, ব্রহ্মোস আজ বিশ্বের দ্রুততম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলির মধ্যে অন্যতম।
আরও পড়ুন: অবশেষে স্বস্তি! যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর ইরান-আমেরিকার, হরমুজ থেকে উঠছে অবরোধ
নতুন ব্রহ্মোস-২ ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে চলেছে এর আকার ও ওজন। বর্তমানে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন প্রায় ৩ টন, আর আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য সংস্করণের ওজন ২.২ থেকে ২.৫ টনের মধ্যে। কিন্তু নতুন এই সংস্করণের ওজন মাত্র ১.৩ থেকে ১.৫ টনের মধ্যে রাখা হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ, এটি বর্তমান ব্রহ্মোসের (BrahMos) প্রায় অর্ধেক ওজনের হবে। শুধু হালকা নয়, এটি আরও ছোট, আরও স্মার্ট এবং স্টিলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন হবে। ফলে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকে এটি মোতায়েন করা অনেক সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে। স্টিলথ প্রযুক্তির কারণে শত্রুপক্ষের রাডারে সহজে ধরা পড়বে না এটি। ফলে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছনোর আগ পর্যন্ত শত্রুরা অনেক ক্ষেত্রেই এর উপস্থিতি টের পাবে না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হাইপারসনিক প্রযুক্তির কারণে এর গতি ঘণ্টায় ৭,৪০০ থেকে ৯,৮০০ কিলোমিটারের মধ্যে হতে পারে। এত উচ্চ গতিতে চলার ফলে আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও একে আটকানো বা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। দ্রুত ও নিখুঁত আঘাত হানার ক্ষমতার জন্য একে ভবিষ্যতের যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও একটি বড় সুবিধা হল, ভবিষ্যতে এই ক্ষেপণাস্ত্র দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান এলসিএ তেজাস থেকেও উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে ভারী ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু নতুন সংস্করণ হালকা হওয়ায় তা ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে আরও বেশি কৌশলগত বিকল্প তুলে দেবে। আপাতত ভূমিভিত্তিক সংস্করণের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। পরে নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর জন্য পৃথক সংস্করণ তৈরি করা হবে।

আরও পড়ুন: সব স্কুলে ৩০ মিনিট করে যোগব্যায়াম! মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এবার আবেদন করবেন অগ্নিমিত্রা
ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এই ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই ফিলিপাইন ব্রহ্মোস (BrahMos) ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইয়ের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ওমান ও মিশরের মতো পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিও সম্ভাব্য ক্রেতার তালিকায় রয়েছে। ভবিষ্যতে ব্রাজিল, চিলি এবং সাইপ্রাসের মতো দেশও এই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারে। সব মিলিয়ে, ব্রহ্মোসের ২৫ বছরের যাত্রাপথে এই নতুন অধ্যায় শুধু ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিকেই নয়, আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারেও তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

















