বাংলাহান্ট ডেস্ক: নেপালের (Nepal) ভয়াবহ হড়পা বানের (Nepal Flash Floods) ধাক্কায় এখনও কাটেনি আতঙ্ক। একের পর এক এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরংয়ের অভিবাসন দফতরও রেহাই পায়নি প্রকৃতির এই তাণ্ডব থেকে। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রীদের নথি যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বহুতল ভবনটি আচমকাই হড়পা বানের জলের তোড়ে ভেসে যায়। প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর দুর্গম এলাকা পেরিয়ে সেখানে পৌঁছয় চিনা উদ্ধারকারী দল। কিন্তু উদ্ধার করার মতো তেমন কিছুই মেলেনি, চারদিকে শুধু কাদা, পাথর আর ধ্বংসাবশেষ। নুয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা, তানাহুন, চিতওয়ান এবং নাওয়ালপারাসির ছবিটাও প্রায় একই। টানা তল্লাশি চললেও বহু নিখোঁজ মানুষের এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি।
ভারতের সাহায্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন নেপালের (Nepal) প্রেসিডেন্টের:
কাঠমান্ডুর সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬৯। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩২০ জন ভারতীয়। অন্যদিকে, নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এখনও উদ্ধারকাজ চলছে এবং ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। শতাধিক মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নুয়াকোটে সবচেয়ে বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে—সেখানে সংখ্যাটি প্রায় ১,৬২২। চিতওয়ান, নাওয়ালপারাসি, গোর্খা, ধাদিং-সহ একাধিক জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক দেহও উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যেই নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে চার ভারতীয় শ্রমিককে নিরাপদে বের করে আনার খবর জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।
আরও পড়ুন: ‘আত্মহত্যা করতে হবে’, কেন বলেছিলেন ফিরহাদ, বিস্ফোরক দাবি কুণালের
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষত কতটা গভীর, তার একটা ধারণা মিলেছে পুনর্গঠনের সম্ভাব্য খরচের হিসাবেও। নেপালের অর্থমন্ত্রী স্পর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ নেপালের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান। যদিও ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের তুলনায় এবারের পুনর্গঠনের খরচ কম হবে বলেই মনে করছেন তিনি। সেই ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং দেশ পুনর্গঠনে খরচ হয়েছিল প্রায় ৯০০ কোটি ডলার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তির খবরও রয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে মাত্র তিন দিনের মধ্যেই প্রায় ২০০ কোটি ডলার জমা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর থেকেই নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির তরফে ইতিমধ্যে প্রায় ৬২ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। প্রথম দিকে বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে নেপালে কাজ করার অনুমতি দিতে কিছুটা অনীহা থাকলেও পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সেই অবস্থান বদলায় কাঠমান্ডু। শনিবার ভারতের বিশেষ উদ্ধারকারী দলও নেপালে পৌঁছে গিয়েছে। সূত্রের খবর, এখনও নেপালের ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ টানেলে প্রায় ৯০০ শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। তাঁদের উদ্ধারে আরও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এই কঠিন সময়ে ভারতের সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল। তিনি জানিয়েছেন, বিপর্যয়ের পরপরই নয়াদিল্লি যেভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও স্পষ্ট করেছেন, এই সঙ্কটকে ভারত শুধু নেপালের সমস্যা হিসেবে দেখছে না।

আরও পড়ুন: গালওয়ান সংঘাতে নেতৃত্ব দেওয়া সেনা আধিকারিক পড়লেন জিনপিংয়ের কোপে! তারপরে যা হল…
তবে উদ্ধার ও ত্রাণের পাশাপাশি এই বিপর্যয়কে ঘিরে চিনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী মাধবপ্রসাদ চৌলাগাইনের অভিযোগ, দুই দেশের মধ্যে আগাম বিপর্যয়-সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হড়পা বান নিয়ে চিন সময়মতো কোনও সতর্কবার্তা পাঠায়নি। তাঁর দাবি, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে হয়তো ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কিছুটা কমানো সম্ভব হত। ২০২৫ সালের একটি তুলনামূলক ছোট হিমবাহ-সংক্রান্ত বিপর্যয়ের পর ভারত ও নেপালের (Nepal) মতোই চিন ও নেপালের মধ্যেও তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তাই এত বড় দুর্যোগের আগে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এখন অবশ্য সবকিছুর আগে লক্ষ্য একটাই—নিখোঁজদের খুঁজে বের করা, আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করা এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে নেপালকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।













