একসময় সাইকেলে বিক্রি করতেন মাখন! আজ ১,০০০ কোটির ব্যবসা, চমকে দেবে সুব্রহ্মনিয়ামের কাহিনি

Published on:

Published on:

Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: আজ জিআরবি ডেয়ারি ফুডস দেশের পরিচিত প্যাকেটজাত খাদ্য সংস্থাগুলির মধ্যে অন্যতম। সংস্থার বার্ষিক রাজস্ব এখন ১,০০০ কোটি টাকার গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের (Success Story) শুরুটা কোনও বড় শিল্পগোষ্ঠী, বিপুল পুঁজি কিংবা ব্যবসায়ী পরিবারের হাত ধরে হয়নি। জি আর সুব্রহ্মনিয়ামের (G R Balasubramaniam) পথচলা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণ পরিস্থিতি থেকে। সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি মাখন বিক্রি করেই তিনি ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসার ভিত তৈরি করেছিলেন। তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) পালানির কাছে চিন্নাকারাত্তুপট্টি নামে ছোট্ট একটি গ্রামে তাঁর শৈশব কেটেছে। সেই সময় গ্রামে প্রায় ৩০০ মানুষের বাস। বিদ্যুৎ, বাস পরিষেবা কিংবা পর্যাপ্ত জল সরবরাহ—কোনও কিছুই সহজলভ্য ছিল না। তাঁর বাবা ছিলেন ছোট কৃষক। পাশাপাশি ডাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনাবেচা করতেন। সাইকেলে করে আশপাশের গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে শহরের বাজারে বিক্রি করতেন তিনি।

জি আর সুব্রহ্মনিয়ামের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)

মাত্র ১৩ বছর বয়সে, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সুব্রহ্মনিয়ামের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। বেঙ্গালুরুতে তাঁর দিদি ও ভগ্নিপতি ছোট করে মাখনের ব্যবসা করতেন এবং তাঁদের একজন সাহায্যকারীর প্রয়োজন ছিল। সেই সময় গ্রাম ছেড়ে বেঙ্গালুরু চলে যান তিনি। পরবর্তী প্রায় ১৪ বছর ওই ব্যবসার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন সুব্রহ্মনিয়াম। এই সময়টা তাঁর কাছে শুধু কাজ শেখার সময় ছিল না, বরং ভবিষ্যতের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার প্রস্তুতিও ছিল। গ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাখন সংগ্রহ করা, বেঙ্গালুরুতে বাড়ি বাড়ি তা পৌঁছে দেওয়া, হিসাব রাখা, ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি—ব্যবসার প্রায় প্রতিটি দিকই তিনি হাতে-কলমে শিখেছিলেন। মাখন থেকে ঘি তৈরি করা এবং সেই পণ্য কীভাবে বাজারে পৌঁছে দিতে হয়, সেই অভিজ্ঞতাও এই সময়েই অর্জন করেন তিনি (Success Story)।

আরও পড়ুন: ব্রিকসে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক পাকিস্তান! সায় ছিল চিনেরও, ভারতের এক চালেই হল স্বপ্নভঙ্গ

১৯৮৪ সালে ২৮ বছর বয়সে নিজের পথ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন সুব্রহ্মনিয়াম। ভগ্নিপতির ব্যবসা ছেড়ে যখন বেরিয়ে আসেন, তখন তাঁর সঞ্চয় ছিল মাত্র প্রায় ৬,০০০ টাকা। একটি ছোট ঘরের জন্য ৩,০০০ টাকা অগ্রিম দেওয়ার পর হাতে পড়ে ছিল মাত্র ৩,০০০ টাকা। বড় কোনও ডিগ্রি ছিল না, পরিবারের কাছ থেকে ব্যবসায় নামার মতো আর্থিক সহায়তাও পাওয়ার সুযোগ ছিল না। তবু চাকরি খোঁজার বদলে নিজের ব্যবসা শুরু করার ঝুঁকি নেন তিনি। প্রাথমিক মূলধনের জন্য ব্যাংক ঋণ বা বড় বিনিয়োগকারীর দিকে না তাকিয়ে চিট ফান্ডের সাহায্য নেন। পরিচিতদের নিয়ে দ্রুত একটি গ্রুপ তৈরি করে দ্বিতীয় মাসের মধ্যেই প্রায় ৫০,০০০ টাকা সংগ্রহ করেন। সেই টাকা দিয়ে বড় পরিমাণে মাখন কিনে ব্যবসা শুরু হয়। প্রথম দিকে মাসে প্রায় ৭৫ কেজি মাখন নিয়ে সাইকেলে করে বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন বাড়িতে পৌঁছে দিতেন তিনি।

ব্যবসা করতে করতেই বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাও তাঁর চোখে পড়ে। মাখন দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিক্রি না হলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হতো। আবার হোটেল ও মিষ্টির দোকানের মতো বড় ক্রেতারা মাখন কিনে নিজেরাই ঘি তৈরি করতেন। এতে সময়ের পাশাপাশি গুণমান নিয়েও সমস্যা দেখা দিত। সুব্রহ্মনিয়াম বুঝতে পারেন, এখানেই নতুন সুযোগ রয়েছে। মাখন থেকে ঘি তৈরি করে যদি প্রস্তুত পণ্য হিসেবে বাজারে দেওয়া যায়, তাহলে ক্রেতার কাজ কমবে এবং মাখন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমবে। সেই ভাবনা থেকেই ঘি তৈরির দিকে এগিয়ে যান তিনি। পরিকল্পনা কাজে দেয়। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ২৫,০০০ টাকায় পৌঁছে যায়। এরপর দোকান ভাড়া নিয়ে কর্মী নিয়োগ করেন এবং ধীরে ধীরে প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ১৯৯১ সালে বেঙ্গালুরুতে জিআরবি-র প্রথম কারখানা তৈরি হয়। পরে দিন্দিগুলে ব্যবসা বাড়ে এবং ১৯৯৯ সালে হোসুরে তৈরি হয় আরও বড় উৎপাদন কেন্দ্র।

Success Story of G R Balasubramaniam will amaze you.

আরও পড়ুন: আরও বাড়ছে ভারত ও চিনের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ! ৬ বছর পর এই রুটে চালু হচ্ছে উড়ান

বেঙ্গালুরুর পর চেন্নাই জিআরবি-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে ওঠে। এরপর তামিলনাড়ু, কর্ণাটক-সহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সংস্থার ব্যবসা। শুধু ঘি বা দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যেই নিজেদের আটকে রাখেনি জিআরবি। সময়ের সঙ্গে মশলার মিশ্রণ, ইনস্ট্যান্ট মিক্স, মিষ্টি, স্ন্যাকস এবং আইসক্রিমের মতো নানা প্যাকেটজাত খাবারও যুক্ত হয়েছে পণ্যের তালিকায়। সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অন্যতম দিক ছিল ব্যবসা থেকে আসা অর্থ ফের ব্যবসাতেই বিনিয়োগ করা এবং শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করা। সেই পথেই কয়েক দশকে ছবিটা পুরো বদলে যায়। ২০১৪ অর্থবর্ষে জিআরবি ডেয়ারি ফুডস প্রাইভেট লিমিটেডের রাজস্ব ছিল প্রায় ১৯০.৬২ কোটি টাকা। ২০২৫ অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৮৪.৪৭ কোটি টাকা। সাইকেলে মাখন বিক্রি করা এক কিশোরের সেই ছোট উদ্যোগই আজ হাজার কোটির ব্যবসায় পরিণত হয়েছে (Success Story)।