বাংলা হান্ট ডেস্কঃ পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য প্রকল্প স্বাস্থ্যসাথী (Swasthya Sathi) নিয়ে প্রকাশিত CAG রিপোর্ট ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রিপোর্টে প্রকল্পের সুবিধাভোগীর তালিকা, হাসপাতালের মান যাচাই, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব এবং সরকারের অতিরিক্ত খরচ, এই সব বিষয় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। CAG-এর দাবি, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় নিয়ম মেনে কাজ হয়নি, যার ফলে আর্থিক চাপ বেড়েছে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে (Swasthya Sathi) কী কী গরমিলের কথা বলেছে CAG রিপোর্ট?
CAG রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে রেশন কার্ডের সংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের (Swasthya Sathi) সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল। এর ফলে প্রকল্পের তালিকায় ভুয়ো সুবিধাভোগী থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লক্ষ পরিবারের হাতে স্বাস্থ্যসাথী স্মার্ট কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে CAG-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, নাম নথিভুক্ত করা এবং স্মার্ট কার্ড তৈরি করতে গিয়ে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসাথীর (Swasthya Sathi) আওতায় থাকা ৫০টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার মধ্যে ৩১টি হাসপাতালকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মানসম্পন্ন হিসেবে দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। এর ফলে বেশি দামের চিকিৎসা প্যাকেজের কারণে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হাসপাতাল ও চিকিৎসা পরিষেবা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন
CAG রিপোর্টে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২ কোটির বেশি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল থাকার কথা থাকলেও তালিকাভুক্ত হাসপাতালের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬০৫টি। পরিদর্শন করা ৬৫টি হাসপাতালের মধ্যে ৩২টিতে চিকিৎসকের ঘাটতি পাওয়া যায়। এছাড়াও ৩৬টি হাসপাতালে নার্সের অভাব এবং ১৬টি হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি সরঞ্জামের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বিমা সংস্থাগুলিকে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের প্রায় ৭ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা বকেয়া ছিল। পরে জরিমানা যুক্ত হয়ে সেই টাকা ৩১ কোটির বেশি হলেও তা পরিশোধ করা হয়নি বলে CAG জানিয়েছে।
স্বাস্থ্যসাথীর খরচ ও রাজ্যের আর্থিক চাপ নিয়ে রিপোর্টে কী বলা হয়েছে?
CAG-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্যাপ্ত বাজেট না থাকার কারণে ২০২২-২৩ সালে রাজ্য সরকারকে প্রায় ৭২১ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছিল। এর ফলে সুদ বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ১১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রিপোর্ট নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগে PM CARES-এর হিসাব দিন, তারপর এই ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ছবিও উঠে এসেছে রিপোর্টে
উল্লেখ্য, শুধু স্বাস্থ্যসাথী (Swasthya Sathi) নয়, রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিস্থিতি নিয়েও CAG রিপোর্টে একাধিক তথ্য দেওয়া হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে ৩৬ শতাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ খালি ছিল। সাধারণ চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও প্রায় ৪৯ শতাংশ পদ ফাঁকা থাকার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া ৮৯ শতাংশ সাব সেন্টারে কোনও পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন না বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিউনিটি হেলথ সেন্টারগুলিতে ৫৪ শতাংশ চিকিৎসকের ঘাটতি ছিল এবং ৯১ শতাংশ জায়গায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ৮০ শতাংশের বেশি কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে রক্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না।
জেলা হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ
CAG রিপোর্টে জেলা হাসপাতালগুলির পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জেলা হাসপাতালগুলিতে ৬৩ শতাংশ চিকিৎসকের পদ খালি রয়েছে। পাশাপাশি ৪৪ শতাংশ প্যারামেডিক্যাল কর্মীর পদও ফাঁকা ছিল। প্রশাসনিক আধিকারিকদের ক্ষেত্রেও প্রায় ৮০ শতাংশ পদ খালি থাকার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ অন্নপূর্ণা যোজনা ৩ হাজার টাকা পাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করলেন মুখ্যমন্ত্রী, কাদের জন্য?
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প (Swasthya Sathi) চালু করা হয়েছিল। এবার সেই প্রকল্পের বাস্তবায়ন, খরচ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো নিয়ে CAG রিপোর্টে ওঠা প্রশ্ন ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।













