বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতের আবহাওয়া এবং অর্থনীতির উপর নতুন করে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে এল নিনো (El Nino)। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন জলবায়ু মডেলের বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, একবার এটি তৈরি হলে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত তার প্রভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে রাষ্ট্রসংঘও এ বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব শুধু আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, জলসম্পদ, স্বাস্থ্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উপরও তার গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
এল নিনোর (El Nino) ভয়াবহতা সম্পর্কে ভারতকে সতর্কবার্তা দিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ
এল নিনো (El Nino) মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি জলবায়ুগত ঘটনা। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ার উপর পড়ে। ভারতের ক্ষেত্রে এল নিনো সাধারণত বর্ষাকে দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত রূপ অনেকটাই নির্ভর করবে ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু বা ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোলের অবস্থার উপর। তবুও যদি বর্ষা দুর্বল হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে কৃষিক্ষেত্রে। ধান, গম, ডাল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। কৃষিজমিতে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জলের অভাব দেখা দিতে পারে এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরও দ্রুত নেমে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোদীকে আমন্ত্রণ, নজরে ভারত-ইরান কূটনীতি
কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতির উপর। বিশেষ করে গ্রামীণ ভারতের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। চাষের খরচ বাড়বে, কারণ কম জলের পরিস্থিতিতে সেচের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। একই সঙ্গে সার, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির খরচও বাড়তে পারে। কৃষকদের আয় কমে গেলে গ্রামীণ অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে খাদ্যশস্যের সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের মতো কৃষিনির্ভর দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গেলে বাজারে চাল, গম, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তার সঙ্গে যদি জ্বালানি ও সার উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পায়, তাহলে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়বে। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির উপর এই প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী এল নিনো পরিস্থিতি দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

শুধু কৃষি বা অর্থনীতি নয়, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এল নিনো (El Nino) উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশ্ব ইতিমধ্যেই একাধিক অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। তার মধ্যেই যদি এল নিনো সক্রিয় হয়, তাহলে ভারতে দীর্ঘস্থায়ী গরম, জলসংকট এবং বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যেতে পারে। নিরাপদ পানীয় জলের অভাব দেখা দিলে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়বে। পাশাপাশি ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পেতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং দরিদ্র পরিবারগুলি এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বেন। তাই বিশেষজ্ঞরা এখন থেকেই জল সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং কৃষি পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাব কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা যায়।

















