বাংলা হান্ট স্পোর্টস ডেস্ক: টানা দ্বিতীয়বার আইপিএল জয়ের স্বাদ পেয়েছে বিরাট কোহলির আরসিবি। দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলে রেকর্ডের প্রাচীর গড়লেও নিজের দলকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা জেতাতে ব্যর্থ হয়েছেন বৈভব সূর্যবংশী। তবে এবারের আইপিএলে নিজেদের পারফরম্যান্সের মধ্যে দিয়ে ইতিহাস তৈরী করেছেন একাধিক তারকা। আর সেই ইতিহাসের নায়কদের নিয়েই গড়া হল এবারের স্বপ্নের একাদশ। একদিকে কিং কোহলির দাপট, অন্যদিকে ১৫ বছরের বিস্ময়-বালক সূর্যবংশীর আগুনে ব্যাটিং। মাঝে বসে আছেন মারকুটে ক্লাসেন থেকে ভারতের সুইং সুলতান ভুবনেশ্বর কুমার। চলুন, দেখে নেওয়া যাক কারা জায়গা পেলেন এই দুর্দান্ত একাদশে।
• ওপেনিং: ঝড় আর চেজমাস্টার •
১. বৈভব সূর্যবংশী (রাজস্থান রয়্যালস) – ৭৭৬ রান, স্ট্রাইক রেট ২৩৭.৩০।
বয়স মাত্র ১৫, কিন্তু ব্যাট হাতে যেন আগুন ছুটিয়ে যান বৈভব। এবারের আইপিএলে ১৬ ইনিংস ব্যাট করে তুলেছেন ৭৭৬ রান, স্ট্রাইক রেট অবিশ্বাস্য ২৩৭.৩০। বর্তমানে তার নাম<span;> শুনলে বোলারদের বেড়ে যায়। একটা শতরানের পাশাপাশি এবার করেছেন মোট পাঁচটা ফিফটি। ভবিষ্যৎ যে তার অত্যন্ত উজ্জ্বল তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আরও পড়ুন: ভেঙে গেল পুরোনো সব রেকর্ড! IPL 2026-এ ইতিহাস বদলে দিলেন কোহলি, গিল, সূর্যবংশী-রা
২. বিরাট কোহলি (রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর) – ৬৭৫ রান, গড় ৫৬.২৫।
সিংহ বুড়ো হতে পারে, কিন্তু শিকার করা ভুলে যায় না। ৬৭৫ রান, গড় ৫৬.২৫, স্ট্রাইক রেট ১৬৫.৮৪। সাথে রয়েছে একটা শতরান ও পাঁচটা অর্ধশতরান। গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে ঠান্ডা মাথায় দলীয় ইনিংসের ভিত গড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে আগ্রাসী ব্যাটিংও করেছেন এই কিংবদন্তী। চাপের মুখে ব্যাট হাতে দলকে সামলানোর পাশাপাশি ফাইনালে করেছেন নিজের আইপিএল কেরিয়ারের দ্রুততম অর্ধশতরান। তাই অনভিজ্ঞ আগ্রাসী বৈভবের পাশে অভিজ্ঞ, বুদ্ধিদীপ্ত কোহলিই হলেন সঠিক ওপেনিং পার্টনার।
• মিডল অর্ডার: যেখানে ম্যাচের ভাগ্য লেখা হয় •
৩. ঈশান কিষান (উইকেটরক্ষক) (সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ) – উইকেটরক্ষক, ৬০২ রান, ১৮২ স্ট্রাইক রেট, গ্লাভস হাতে ৯ ক্যাচ, ১ স্টাম্পিং।
সানরাইজার্সের হয়ে তিন নম্বরে নেমে বোলারদের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছেন। অভিষেক শর্মা বা হেডের মতো ক্রিকেটাররা তাড়াতাড়ি ড্রেসিংরুমে ফিরলেও তার খেলায় ঐসব ঘটনার কোনও প্রভাব পড়েনি। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি গ্লাভস হাতে উইকেটের পেছনেও তিনি দলকে নির্ভরতা দিয়েছেন। দুর্দান্ত কিপিং না করলেও তিনি নয়টি ক্যাচ নেওয়ার পাশাপাশি একটি স্টাম্পিংও করেছেন গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে।
আরও পড়ুন: সবার আগে দেশ! সেমিফাইনালেও পাকিস্তানের মুখোমুখি নয়, WCL ২০২৫ থেকে নাম প্রত্যাহার ভারতের
৪. হেনরিক ক্লাসেন (সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ ) – ৬২৪ রান, গড় ৪৮.০০।
স্পিনারদের যম। ১৬০ স্ট্রাইক রেটে ৬২৪ রান করার পাশাপাশি ৬ বার পার করেছেন অর্ধশতরানের গন্ডি। ১৪২৬ টি ছক্কার মরশুমে ক্লাসেন ছিলেন বৈভবের পাশাপাশি বোলারদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। হায়দরাবাদের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করে দলকে প্লে অফে পৌঁছানোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন তিনি।
৫. রজত পতিদার (অধিনায়ক) (রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর) – ৫০১ রান, স্ট্রাইক রেট ১৯২.৫৯।
নীরব ঘাতক। কোহলি যখন এক প্রান্ত সামলে রাখতেন, পতিদার তখন অন্য প্রান্তে বোলারদের ওপর তান্ডব চালাতেন। টুর্নামেন্টে খুব বেশি রান সংগ্রহ না করলেও তার আগ্রাসী ব্যাটিংই ছিল আরসিবির সাফল্যের মূল কারণ। কয়েকটি ম্যাচে একক দক্ষতায় জয় এনে দিয়েছেন দলকে। টানা ১৭ বছর ধরে ট্রফি না জেতা দলকে তিনি পরপর দুটি ট্রফি জিতিয়েছেন। তাই এই সেরা একাদশের অধিনায়কও তিনিই।
*অলরাউন্ড দক্ষতা, চাপের মুখে বুক চিতিয়ে লড়া যোদ্ধা*
৬. জেসন হোল্ডার (গুজরাট টাইটান্স) – ১৭ উইকেট, ইকোনমি ৭.৫৬।
৬ ফুট ৭ ইঞ্চির ক্যারিবিয়ান দৈত্য। ১১ ম্যাচে ১৭ উইকেট, ইকোনমি মাত্র ৭.৫৬, গড় ১৭.০৫। এবারের টুর্নামেন্টে গুজরাট টাইটান্সের শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি। কিন্তু যেইদিন থেকে দলে এসেছেন হোল্ডার তবে সেইদিন থেকে তিনি দলের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন। ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন খুব একটা বেশি পড়েনি, কিন্তু বল হাতে তিনি নিজেকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছেন।
• স্পিন রহস্য •
৭. সুনীল নারায়ন (কলকাতা নাইট রাইডার্স) – ১৫ উইকেট, ইকোনমি ৬.৬৪।
রহস্যই তার অস্ত্র। এই মিলিয়ন ডলার লিগে ১৫ বছর কাটিয়ে ফেললেও তার রহস্য এখনো পুরোপুরি ভেদ করে উঠতে পারেনি বিপক্ষের ব্যাটাররা। বল হাতে এই মরশুমেও কেকেআরের সেরা বোলার ছিলেন তিনিই। কৃপণ বোলিং করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করার পাশাপাশি নিয়মিত উইকেট তুলতে সক্ষম সুনীল নারায়ন অবশ্যই এই সেরা একাদশের অংশ।
৮. অকিল হোসেন (চেন্নাই সুপার কিংস) – ৮ উইকেট, ৫৮ ডট বল।
মাত্র ৭ ম্যাচ। কিন্তু ইমপ্যাক্ট? মারাত্মক। উইকেট, ইকোনমি ৮.২৫। ভুলে গেলে চলবে না যে পাওয়ার প্লে-তেও বোলিং করেছেন এই ক্যারিবিয়ান স্পিনার। নিঃশব্দ একেই হয়তো একেই বলে। সদ্যসমাপ্ত টুর্নামেন্ট একেবারেই ভালো যায়নি চেন্নাই সুপার কিংসের। কিন্তু বল হাতে আকিল হোসেনের পারফরম্যান্স তাদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। বল হাতে মোট তিনটি ম্যাচে তিনি এই ছক্কা সর্বস্ব মরশুমে ৬-এর নিচে ইকোনোমি রেখে বল করে গিয়েছেন যা আর কোনো বোলার করে দেখাতে পারেননি। পরের মরশুমে তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে সিএসকে।
• পেস ব্যাটারি: গতির কাছে আত্মসমর্পণ •
৯. জোফ্রা আর্চার (রাজস্থান রয়্যালস) – ২৫ উইকেট, গড় ২২.৩৬।
১৬ ম্যাচে ২৫ উইকেটে নেওয়া এই পেসার ছিলেন এই মরশুমের রাজস্থানের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পেছনে একটি অন্যতম বড় কারণ। নিয়মিত শুরুর ওভারগুলিতে উইকেট তুলে তিনি দলকে সাহায্য করে গিয়েছেন। বিপক্ষের ব্যাটাররা আক্রমণ করলেও তিনি নিজের পরিকল্পনা বদলে ফেলেননি ফলে হয়তো একটু রান খরচ করেছেন, কিন্তু সাফল্যও পেয়েছেন ভরপুর।
১০. ভুবনেশ্বর কুমার (রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর) – ২৮ উইকেট, ইকোনমি ৭.৯৫।
সুইংয়ের সম্রাট। ব্যাটিং সর্বস্ব এই টুর্নামেন্টে পাওয়ার প্লে ও ডেথ ওভারে বোলিং করেও তার ইকোনমির রেট ৮-এর নিচে। আরসিবির সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ গুলির মধ্যে একটি হলো ভুবির অসাধারণ বোলিং। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার না জিতলেও অনেকেই মনে করেন সেই এই টুর্নামেন্টের সেরা তারকা ছিলেন তিনিই। রান আটকে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত উইকেট তুলে তিনি আরসিবি ভক্তদের দ্বিতীয় খেতাব জেতার স্বাদ উপহার দিয়েছেন।
১১. কাগিসো রাবাদা (গুজরাত টাইটান্স) – ২৯ উইকেট, গড় ২১.৫৮।
টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। যে কোনো সময়ে তার হাতে নিশ্চিন্তে বল তুলে দিতে পারেন দলের অধিনায়ক। ব্যাটারদের আগ্রাসনের সামনে গুটিয়ে না গিয়ে নিজের নীতিতে অচল থাকেন রাবাডা। নিঃসন্দেহে তিনি এই সেরা একাদশের অংশ।
• শেষ কথা: এটা টিম নয়, প্রতিপক্ষর ত্রাস •
এই একাদশ মাঠে নামলে প্রতিপক্ষের কপালে ঘাম ছুটবে। সূর্যবংশীর বিস্ফোরণ দিয়ে শুরু, কোহলির ক্লাস দিয়ে শেষ। মাঝে ক্লাসেন-পতিদারের তাণ্ডব। বল হাতে ভুবির সুইং, আর্চার-রাবাদার আগুন, নারায়নের রহস্য। এদের হারাতে গেলে শুধু ক্রিকেটীয় দক্ষতা নয়, প্রয়োজন অলৌকিক শক্তির।












