বাংলা হান্ট ডেস্ক: ছোটবেলায় পড়াশোনা, খেলাধুলা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা। কিন্তু সেই শৈশব (Childhood) ও কৈশোরই অনেকের কাছে এখন মানসিক চাপের (Mental Health) কারণ হয়ে উঠছে। ভালো নম্বর পাওয়ার তাগিদ, পরীক্ষায় খারাপ করার ভয়, বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণের চাপ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে অনেক পড়ুয়াই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অথচ অনেক সময় তারা নিজেদের উদ্বেগের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে না। তাদের আচরণকে স্বাভাবিক বয়সজনিত পরিবর্তন কিংবা পড়াশোনায় অনীহা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে তাই শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নতুন করে নজর দেওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রতি সাত জনের মধ্যে প্রায় এক জন কোনও না কোনও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে।
কেন বিগড়াচ্ছে স্কুলপড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের (Mental Health) হাল?
ভারতের স্কুলপড়ুয়াদের পরিস্থিতিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি)-এর একটি সমীক্ষায় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ৩,৭৯,৮৪২ জন পড়ুয়ার মতামত নেওয়া হয়েছিল। দেশের ২৮টি রাজ্য এবং আটটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পড়ুয়াদের নিয়ে করা ওই সমীক্ষায় ৮১ শতাংশ জানিয়েছিল, পড়াশোনা, পরীক্ষা ও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। ১১ শতাংশ পড়ুয়া উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল, ১৪ শতাংশ তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কথা বলেছিল এবং ৪৩ শতাংশের মধ্যে মেজাজের ঘন ঘন পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। তবে উদ্বেগ অনুভব করা এবং মানসিক অসুস্থতায় ভোগা এক বিষয় নয়। এই পরিসংখ্যানগুলি পড়ুয়াদের মানসিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরে, যদিও প্রত্যেক শিশুর অভিজ্ঞতা আলাদা (Mental Health)।
আরও পড়ুন: বিক্ষোভে মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ট্রেন বাতিল! দিল্লির ঘটনায় রবিবার সুপ্রিম কোর্টে বড় শুনানি
পড়াশোনার চাপের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে সাফল্য পাওয়ার প্রত্যাশাও। ভালো স্কুল বা কলেজে ভর্তি হওয়া, ভবিষ্যতে পছন্দের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া কিংবা অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতা অনেক সময় শিশুদের উপর বাড়তি বোঝা তৈরি করে। এনসিইআরটি-র সমীক্ষায় ৮৪ শতাংশ পড়ুয়া জানিয়েছিল, নিজেদের সাফল্যের জন্য তারা নিজেদেরই দায়ী মনে করে। অর্থাৎ, ভালো ফল করার ইচ্ছার পাশাপাশি প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয়ও তাদের তাড়া করতে পারে। এর সঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা, উপহাস কিংবা সহপাঠীদের হাতে হেনস্থার অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বয়স ও শ্রেণি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পড়ুয়ার আত্মবিশ্বাস এবং স্কুল ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি কমে যায়।
পড়ুয়াদের মানসিক অবস্থার ছবিতে আবার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ওই সমীক্ষায় ৬৭ শতাংশ পড়ুয়া জানিয়েছিল, তাদের সবচেয়ে সাধারণ অনুভূতি হল সুখ। তবে প্রায় ৪৯ শতাংশ নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল এবং ৪৫ শতাংশ নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে খুশি ছিল না। অর্থাৎ, বাইরে থেকে স্বাভাবিক বা হাসিখুশি দেখালেও কোনও শিশু ভিতরে ভিতরে দুশ্চিন্তা কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে পারে। নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ না পেলে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে। সমীক্ষায় প্রায় ৪৯ শতাংশ পড়ুয়া বন্ধুদের সঙ্গে নিজেদের মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। অন্যদিকে, মাত্র ২৪ শতাংশ বাবা-মায়ের সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নিত বলে জানিয়েছিল। এই ব্যবধান অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে খোলামেলা কথোপকথনের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে আনে।

আরও পড়ুন: রয়েছে জার্মান নাগরিকত্ব? কীভাবে আন্দোলনে যোগ দিলেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি? উঠছে প্রশ্ন
শিশুদের মানসিক চাপ (Mental Health) কমাতে পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। ভালো নম্বরকেই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি না করে সন্তানের পরিশ্রম, আগ্রহ ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজের উন্নতির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্কুলে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পড়ুয়ারা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারে। দীর্ঘদিন উদ্বেগ, মন খারাপ, ঘুমের সমস্যা কিংবা আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা গেলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। মনে রাখা দরকার, পরীক্ষার নম্বর জীবনের একটি অংশ মাত্র। শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক শান্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।













