বাংলাহান্ট ডেস্ক: রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) ভারতের (India) স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতে নতুন করে সমর্থন এল ইউরোপ থেকে। নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার অধিবেশনের ফাঁকে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের (S. Jaishankar) সঙ্গে বৈঠক করেন মধ্য ইউরোপের চার দেশের বিদেশমন্ত্রীরা। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্রকে নিয়ে গঠিত ভিসেগ্রাদ গ্রুপ বা V4-এর এই বৈঠকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্কার এবং নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর স্লোভাকিয়ার বিদেশমন্ত্রী জুরাজ ব্লানার জানান, তাঁদের দেশগুলি ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের ভূমিকার কথা মাথায় রেখে এই সমর্থন করা হচ্ছে।
UNSC-তে ভারতকে (India) স্থায়ী সদস্য করার দাবিকে সমর্থন ৪ ইউরোপীয় দেশের
নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো বদলের দাবি অবশ্য ভারতের (India) কাছে নতুন নয়। ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রতিষ্ঠার সময়কার আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং বর্তমান বিশ্বের মধ্যে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে—দীর্ঘদিন ধরেই এই যুক্তি দিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ তখন ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকলেও পরবর্তীকালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাবের দিক থেকেও অনেক দেশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোয় থাকা উচিত বলে মনে করে ভারত। V4-এর সাম্প্রতিক সমর্থন সেই বৃহত্তর সংস্কার-আলোচনাতেই ভারতের দাবিকে আরও দৃশ্যমান করল।
বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য হল আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চিন। এই পাঁচ দেশের কাছেই ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এর পাশাপাশি ১০টি অস্থায়ী সদস্য দেশ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়। ভারত এখনও পর্যন্ত আট বার অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদে জায়গা পেয়েছে, যার সর্বশেষ মেয়াদ ছিল ২০২১-২২। তবে স্থায়ী সদস্যপদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত আরও জটিল, কারণ পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রসংঘের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সদস্য দেশগুলির বিস্তৃত সমর্থনের পাশাপাশি স্থায়ী সদস্যদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের দাবিকে ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া এবং আমেরিকা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে। চিনের অবস্থান তুলনায় সতর্ক; বেজিঙের বক্তব্য, আগে বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার হওয়া প্রয়োজন।
স্থায়ী সদস্যপদ নিয়ে ভারতের সঙ্গে একই দাবিতে রয়েছে জি৪ গোষ্ঠীর অন্য তিন সদস্য—ব্রাজিল, জার্মানি এবং জাপান। এই চার দেশ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী ও অস্থায়ী—দুই ধরনের সদস্যপদই বাড়ানোর পক্ষে। জি৪-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, আফ্রিকা থেকে দু’টি, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে দু’টি এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে একটি করে নতুন স্থায়ী সদস্য নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অস্থায়ী সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানোর পক্ষে তারা। ফলে ভারতের দাবিটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নিরাপত্তা পরিষদের সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত।

নিরাপত্তা পরিষদের মূল দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। যুদ্ধ, সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। সেই জায়গায় বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভারতের (India) প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানোর প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলোচিত। পাশাপাশি রাষ্ট্রসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও ভারত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। নিউ ইয়র্কে জয়শঙ্করের সঙ্গে V4 দেশগুলির বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে ঐকমত্যের বিষয়টি সামনে আসায় ভারতের দাবির পক্ষে ইউরোপীয় সমর্থনের আরেকটি নজির তৈরি হল। তবে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং এর জন্য রাষ্ট্রসংঘের সংস্কার নিয়ে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমঝোতা প্রয়োজন।














