বাংলাহান্ট ডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে আসছে বন্ধু দেশ রাশিয়া। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কম দামে রুশ তেল (Fuel Crisis) কেনা জারি রাখায় আন্তর্জাতিক মহলে বহুবার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে নয়াদিল্লিকে। এমনকি হরমুজ সংকটের সময়ও যখন গোটা বিশ্ব জ্বালানি সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তখনও রাশিয়াই ভারতকে (India) আশ্বাস দেয় যত তেল দরকার হবে নয়াদিল্লিকে তা দিয়ে সাহায্য করবে রাশিয়া (Russia)। তবে এবার চিত্রটা পুরোটাই পাল্টে গেল। এবার আন্তর্জাতিক বাজারের দুরাবস্থার আঁচ গিয়ে লাগল খোদ রাশিয়াতেই। জ্বালানি সংকটে জর্জরিত রাশিয়াই এবার ভারত থেকে গ্যাসোলিন আমদানি শুরু করেছে। কয়েক বছর আগেও যে দেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেই দেশকে নিজের চাহিদা মেটাতে ভারতের মতো অংশীদার দেশের দিকে হাত বাড়াতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
জ্বালানি সঙ্কটে (Fuel Crisis) জর্জরিত রাশিয়ায় এবার গ্যাসোলিন পাঠাচ্ছে ভারত:
সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই ভারত থেকে অন্তত ৬০ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন রাশিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে। অন্য কিছু সূত্রের মতে, এই পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টনও ছুঁয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভারতের কোন শোধনাগার থেকে এই গ্যাসোলিন রপ্তানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। জানা যাচ্ছে শুধু ভারতই নয়, রাশিয়া আরও বেশ কয়েকটি দেশের কাছ থেকেও গ্যাসোলিন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত বদলে যাওয়া বাস্তবতার প্রতিফলন। যুদ্ধের আগে যে রাশিয়া, ইউরোপ সহ বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি সরবরাহ করত, আজ সেই দেশকেই নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন:অরুণাচলের ‘জমি দখল’ করে একী কাণ্ড চিনের! উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়ল এমন ছবি, জানলে অবাক হবেন
রাশিয়ায় বর্তমানে গ্যাসোলিনের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড়সড় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকালে দেশটির দৈনিক গ্যাসোলিনের প্রয়োজন প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার মেট্রিক টন। সাধারণ পরিস্থিতিতে এই চাহিদার বেশিরভাগই দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকেই পূরণ করা হয়। কিন্তু গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে একের পর এক ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক তেল শোধনাগার ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র। ফলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। জ্বালানির ঘাটতি বাড়তেই প্রশাসন গ্যাসোলিন বিক্রির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট সীমার বেশি জ্বালানি বিক্রি করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে বাজারে দামও দ্রুত বাড়ছে। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বহু জায়গায় সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাসোলিন সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও স্বীকার করেছেন যে ইউক্রেনের হামলায় দেশের জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, তেল শোধনাগার এবং উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে ধারাবাহিক ড্রোন হামলাই বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই একদিকে যেমন জ্বালানি রপ্তানির উপর কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা জোরদার ও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পুতিন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এমন কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে তেল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামোর নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: মনরেগার বদলে চালু হয়েছে জি রাম জি প্রকল্প! পুরনো জব কার্ড আর চলবে কিনা জানুন
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার ভারত থেকে গ্যাসোলিন আমদানি কেবল একটি অস্থায়ী বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি (Fuel Crisis) বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত চিত্রেরও ইঙ্গিত। ভারত একদিকে যেমন রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে নিজস্ব শোধনাগারে তা প্রক্রিয়াকরণ করছে, অন্যদিকে প্রয়োজনে সেই পরিশোধিত জ্বালানিই আবার আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করছে। এই ঘটনায় ভারতের জ্বালানি পরিশোধন ক্ষমতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অভিঘাত কত দ্রুত একটি শক্তিশালী জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশকেও আমদানিনির্ভর অবস্থায় পৌঁছে দিতে পারে।













