বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারত-চিন সীমান্তে অরুণাচল প্রদেশে (Arunachal Pradesh) ক্রমশ বাড়ছে চাপা উত্তেজনা। অরুণাচল সংলগ্ন তিব্বত সীমান্তে নতুন করে নির্মাণ তৎপরতার গতি বাড়িয়েছে চিন। উচ্চ-রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, এমন একটি এলাকায় নতুন রাস্তা এবং অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা বর্তমানে চিনের (China) নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ভারতের (India) সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী ম্যাকমোহন রেখার অন্তর্ভুক্ত। এই নির্মাণকাজ ঘিরে কৌশলগত মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ বা নতুন সেনা শিবির স্থাপনের দাবি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তবুও সীমান্তে দ্রুত পরিকাঠামো নির্মাণ যে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অরুণাচলের (Arunachal Pradesh) ‘জমি দখল’ করে একী কাণ্ড চিনের!
জানা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলটি ভারতের দাবি অনুযায়ী অরুণাচল প্রদেশের (Arunachal Pradesh) আপার সুবনসিরি জেলার অন্তর্গত। তবে ১৯৫৯ সাল থেকে এলাকাটি চিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বর্তমানে তা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখারও ওপারে অবস্থিত। ভারত কখনও এই ভূখণ্ডের উপর নিজেদের দাবি প্রত্যাহার করেনি। দুই দেশের মধ্যে সীমান্তের চূড়ান্ত নির্ধারণ না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চল নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে আরও দেখা গিয়েছে, ২০২১ সালে সীমান্তের কাছে প্রায় ৫০টি স্থাপনা নিয়ে একটি গ্রাম গড়ে তুলেছিল চিন (China)। এবার সেই গ্রামের সঙ্গে আরও একটি নতুন বসতির সংযোগ স্থাপনের জন্য রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন গ্রামটি পুরনো বসতি থেকে প্রায় ৯.৪২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বসতির অধিকাংশ অংশ চিনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হলেও একটি স্থাপনা এবং দুটি হেলিপ্যাড ভারতের (India) দাবি করা ভূখণ্ডের মধ্যে পড়তে পারে। যদিও সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত না হওয়ায় এই অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন:গাড়িতে বস্তা ভর্তি ঘুষের টাকা, আসত এক তৃণমূল বিধায়কের ঠিকানায়! প্রাথমিকের চার্জশিটে বিস্ফোরক CBI
অন্যদিকে, আপার সুবনসিরির ‘নাহ’ জনজাতির একটি কল্যাণ সমিতি সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে অভিযোগ করেছে, গত ছয় বছরে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ধাপে ধাপে তাদের পূর্বপুরুষদের চারণভূমি, কৃষিজমি এবং শিকারক্ষেত্র দখল করেছে। সংগঠনের দাবি, বিতর্কিত এলাকায় রাস্তা, সামরিক শিবির এবং অন্যান্য অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। সেনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ বা নতুন সেনা ঘাঁটি তৈরির খবরের কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। তবে সীমান্ত এলাকায় চিনের পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৯ সালেই অরুণাচলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বিজেপি সাংসদ তাপির গাও। তাঁর দাবি ছিল, ভবিষ্যতে ডোকলামের মতো পরিস্থিতি অরুণাচলেও তৈরি হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যামিয়েন সাইমনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে নতুন গ্রামটির নির্মাণকাজ উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত এগিয়েছে। এলাকাজুড়ে নতুন রাস্তা, পাকা সংযোগপথ, একাধিক শাখা রাস্তা, দুটি হেলিপ্যাড, স্থায়ী ভবন, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল এবং পার্ক করা যানবাহনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। এসব থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে ইতিমধ্যেই বসবাস শুরু হয়েছে অথবা খুব শীঘ্রই স্থায়ী জনবসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সীমান্তে এই ধরনের পরিকাঠামো নির্মাণ সামরিক ও প্রশাসনিক উপস্থিতি শক্তিশালী করার কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এটি সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম মোতায়েনের সুবিধাও বাড়াতে পারে বলে মত তাঁদের।

আরও পড়ুন: টাটা ক্যান্সার হাসপাতাল-সহ একাধিক রুটে নতুন বাস পরিষেবা শুরু
চিনের এই দ্রুত নির্মাণকাজের পাল্টা হিসেবে সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর দিয়েছে ভারতও। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মাণ ১,৭৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ অরুণাচল (Arunachal Pradesh) ফ্রন্টিয়ার হাইওয়ে সীমান্তের খুব কাছ দিয়ে যাবে, যা সেনা মোতায়েন, রসদ সরবরাহ এবং নজরদারির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘ভাইব্র্যান্ট ভিলেজেস প্রোগ্রাম’-এর আওতায় সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে রাস্তা, সেতু, কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি শক্তিশালী জনপরিকাঠামো গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই অরুণাচল সীমান্তে ভারত ও চিন—উভয় দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নের এই প্রতিযোগিতা আগামী দিনে সীমান্ত রাজনীতিতে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।













