বাংলাহান্ট ডেস্ক: উদ্যোক্তা ঋতু পাঠকের সাফল্যের গল্প (Success Story) আজ দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। মাত্র ৬ লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ কয়েক কোটি টাকার সফল ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিনোদ সিংকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এইচএম হার্বালস’। বর্তমানে সংস্থাটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ২.২ কোটি টাকা এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১০ কোটি টাকার রাজস্ব ছোঁয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে তারা। শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বনির্ভর করে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই সংস্থা। আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৬৫০ জনেরও বেশি কৃষক ও ছোট উদ্যোক্তা এই প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছেন।
ঋতু পাঠকের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
ঋতু পাঠকের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে ছিল একটি বাস্তব সমস্যা। সুগন্ধি ও ভেষজ ফসলের চাষের জন্য উপযুক্ত পাতন যন্ত্র খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখেন, বাজারে উপলব্ধ অধিকাংশ যন্ত্রই অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জ্বালানি অপচয়কারী এবং কাঙ্ক্ষিত মানের এসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনে সক্ষম নয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ও বিনোদ সিং সিদ্ধান্ত নেন নিজেদের প্রযুক্তি তৈরি করার। ভেষজ, ফুল, পাতা ও শিকড়ের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা মাত্র ৬ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে ‘এইচএম হার্বালস’-এর সূচনা করেন। প্রথমদিকে সংস্থার তৈরি ২,০০০ লিটারের একটি হাইড্রো ডিস্টিলেশন ইউনিট একজন কৃষকের কাছে ১.৫ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। সেই ছোট্ট সাফল্যই ভবিষ্যতের বড় পথচলার ভিত্তি গড়ে দেয় (Success Story)।
আরও পড়ুন: হুইস্কি থেকে বিলাসবহুল গাড়ি! ১৫ জুলাই থেকে দাম কমছে একাধিক জিনিসের, তালিকায় রয়েছে কী কী?
শুরুর দিনগুলো অবশ্য মোটেই সহজ ছিল না। নতুন সংস্থার প্রতি গ্রাহকদের আস্থা তৈরি করা এবং নিয়মিত নগদ অর্থের প্রবাহ বজায় রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ঋতু পাঠক মাঠে নেমে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন, আকর্ষণীয় ছাড় দেন এবং বিক্রির পরেও উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করেন। ধীরে ধীরে গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জন করে সংস্থাটি। বর্তমানে এইচএম হার্বালস মিনি ডিস্টিলেশন ইউনিট, ফিল্ড ডিস্টিলেশন, হাইড্রো ডিস্টিলেশন, এক্সট্র্যাক্ট ডিস্টিলেশন এবং ইলেকট্রিক ডিস্টিলেশন সিস্টেমসহ একাধিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র তৈরি করছে। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এই যন্ত্রের দাম শুরু হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা থেকে, আর বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্নত মডেলের দাম ৮০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আয়ুর্বেদ, প্রসাধনী, ওষুধশিল্প এবং ওয়েলনেস খাতে এসেনশিয়াল অয়েল, ভেষজ নির্যাস ও গোলাপ জল তৈরিতে এই যন্ত্রগুলোর ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণ করে ঋতু বুঝতে পেরেছিলেন যে বড় সংস্থাগুলি মূলত ভারী শিল্প যন্ত্রপাতি তৈরির দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী এবং কার্যকর প্রযুক্তির বড় অভাব রয়েছে। সেই সুযোগকেই কাজে লাগায় তাঁর সংস্থা। গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে তারা এমন বৈদ্যুতিক পাতন যন্ত্র তৈরি করেছে, যা প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম জ্বালানি ব্যবহার করে এবং মাত্র ৫ শতাংশ পানি খরচ করে। বর্তমানে সংস্থাটি টাচ-প্যানেলভিত্তিক ডেটা মনিটরিং সিস্টেম তৈরির কাজও করছে, যার মাধ্যমে যন্ত্র পরিচালনা আরও সহজ হবে এবং শ্রমনির্ভরতাও অনেকটাই কমবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির এই উদ্ভাবন সংস্থাটিকে প্রতিযোগিতার বাজারে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: যেকোনও সময় হতে পারেন খুন! আশঙ্কায় রয়েছেন ট্রাম্প, জানালেন, ‘আপনারা আমাকে মিস করবেন’
বর্তমানে এইচএম হার্বালসের ২৪ জন কর্মীর একটি দক্ষ দল এবং প্রায় ৬,৭০০ বর্গফুটের আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। সংস্থাটি ইতিমধ্যেই ৪,০০০-এর বেশি গ্রাহকের কাছে ১,১২২টিরও বেশি মেশিন সরবরাহ করেছে। ২০১৬ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে প্রথম রপ্তানি অর্ডার পাওয়ার পর আজ তাদের পণ্য নেপাল, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতেও রপ্তানি হচ্ছে। মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ আসে বিদেশি বাজার থেকে। হিন্দালকো এবং টাটা সিএসআর-এর মতো বড় সংস্থাও তাদের গ্রাহকের তালিকায় রয়েছে। তবে ঋতু পাঠকের কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য (Success Story) হলো, তাঁর সংস্থার প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের প্রায় ৫,৯০০ একর জমিতে কাজ করা ৬০০ থেকে ৬৫০ জন কৃষক উৎপাদন বাড়াতে এবং আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পেরেছেন। সীমিত পুঁজি, সঠিক পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা থাকলে যে একটি ছোট উদ্যোগও জাতীয় পর্যায়ের সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, ঋতু পাঠকের এই যাত্রা তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

















