বাংলাহান্ট ডেস্ক: আজকের সাফল্যের কাহিনি (Success Story) এমন এক দম্পতিকে নিয়ে যারা দুবাইয়ের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে বেছে নিয়েছেন দেশের (India) মাটিতে পরিশ্রমের রাস্তা। দুবাইয়ের ঝাঁ-চকচকে কর্পোরেট জীবন, বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি, বিলাসবহুল গাড়ি—সবই ছিল তাঁদের জীবনের অংশ। কিন্তু আজ সেই দম্পতির পরিচয় কর্পোরেট পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং সফল জৈবচাষি হিসেবে। রাকেশ আনন্দ (Rakesh Anand) আইআইটি-বোম্বে থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক এবং তাঁর স্ত্রী রূপিকা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। দুবাইয়ের বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা ও ব্যাঙ্কে বেশ কয়েক বছর কাজ করার পর পারিবারিক কারণে ২০০১ সালে তাঁরা ভারতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে কর্পোরেট কাজের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন তাঁরা। কিন্তু ২০১৬ সালে রূপিকার গুরুতর ফুসফুসের অসুখ ধরা পড়ার পর বদলে যায় তাঁদের জীবনের গতিপথ। চিকিৎসকদের কাছ থেকে মাত্র পাঁচ বছর আয়ুর কথা শুনে তাঁরা জীবনযাপন ও খাবারের ধরন আমূল বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।
রাকেশ-রূপিকার অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
সেই সিদ্ধান্ত থেকেই ধীরে ধীরে কৃষির দিকে তাঁদের ঝোঁক তৈরি হয়। দুজনেরই কৃষিকাজের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই শুরু হয় শেখার পর্ব। জৈবচাষ বিশেষজ্ঞ আকাশ চৌরাসিয়ার ইউটিউবের ভিডিও দেখে তাঁরা প্রথমে বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেন। পরে মধ্যপ্রদেশের সাগরে গিয়ে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণও করেন। সেখানে বহুস্তরীয় চাষ, জৈব সার তৈরি এবং প্রাকৃতিক উপায়ে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় হাতে-কলমে শেখেন তাঁরা। ২০১৮ সালে নয়ডায় এক বন্ধুর দুই একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে টমেটো, পালং, লঙ্কা ও লেবু চাষ দিয়ে শুরু হয় তাঁদের নতুন যাত্রা। ফলন এবং পরিচিতদের প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক হওয়ায় আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এরপর বুলন্দশহরে সাত একর জমি লিজ নিয়ে কাজ বাড়ান তাঁরা। পরে হাপুরের পিলখুয়ায় জমি কেনা ও লিজ নেওয়ার মাধ্যমে খামরের পরিধি আরও বাড়তে থাকে (Success Story)।
আরও পড়ুন: নিম্নচাপের প্রভাব এখনও কাটেনি! কলকাতা-সহ বঙ্গে দিনভর বৃষ্টির সম্ভাবনা: আবহাওয়ার আপডেট
আজ তাঁদের জৈব খামারটি প্রায় ১৫ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত। সেখানে একসঙ্গে চাষ হচ্ছে ডাল, বিভিন্ন ধরনের শস্য, বাজরা, তৈলবীজ, শাকসবজি এবং একাধিক ফল। শারবতী ও খাপলি গম থেকে শুরু করে বাসমতি চাল, আবার স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো ও তুঁতের মতো তুলনামূলকভাবে আলাদা ধরনের ফলও রয়েছে তাঁদের তালিকায়। খামারে রয়েছে পাঁচটি দেশি গরু নিয়ে ছোট একটি দুগ্ধ ইউনিট। গরুর গোবর ও গোমূত্র ফেলে না দিয়ে জমিতে জৈব সার এবং প্রাকৃতিক কীটনাশক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। রাকেশ মূলত চাষের প্রযুক্তি, খামারের দৈনন্দিন পরিচালনা এবং মাটির স্বাস্থ্য দেখেন। অন্যদিকে রূপিকা সামলান পণ্যের বিপণন, প্যাকেজিং, সরবরাহ এবং ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে শুধু খামারের ফসল বিক্রি করেই থেমে থাকেননি রাকেশ-রূপিকা। তাঁরা বুঝেছিলেন, উৎপাদিত কৃষিপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে পারলে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে তাঁদের একাধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য। কোল্ড-প্রেসড তেল, বিলোনা এ২ ঘি, মাল্টিগ্রেন আটা, ভেষজ জুস, আচার, জ্যাম, চ্যবনপ্রাশ থেকে শুরু করে গুজিয়া, বাজরা ও ওটসের রুটি-কুলচা এবং ফলের আইসক্রিম—তাঁদের পণ্যের তালিকা এখন বেশ বড়। বছরে গড়ে ৯-১০ টন পণ্য উৎপাদন করে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজি বা লিটারে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দামে বিক্রি হওয়া এই পণ্যগুলির ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ৪৭-৪৮ লক্ষ টাকা রাজস্ব আসে।

আরও পড়ুন: চালকহীন গাড়ির পরিকল্পনাতেই বড় ছাঁটাই! চাকরি যাচ্ছে উবেরের ৩,৩০০ কর্মীর
জৈব চাষকে তাঁরা শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখেননি, বরং একটি জীবনধারার অংশ করে তুলেছেন। সেই ভাবনাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁদের খামারে শুরু হয়েছে ‘ফার্ম-টু-টেবিল’ কৃষি-পর্যটনও। মাটির উনুনে রান্না করা সর্ষে শাক, ভুট্টার রুটি-সহ নানা ঘরোয়া খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পান সেখানে আসা মানুষজন। একসময় কর্পোরেট দুনিয়ার আরাম-আয়েশে অভ্যস্ত এই দম্পতির কাছে আজ মাটি, ফসল আর প্রাকৃতিক জীবনই হয়ে উঠেছে নতুন পরিচয়। তাঁদের এই পথচলা এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে, সন্তানরাও কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে পরিবারের ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন। ফলে রাকেশ ও রূপিকার শুরু করা ছোট্ট পরীক্ষামূলক চাষ এখন শুধু একটি ১৫ একরের খামার নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ (Success Story)।













