বাংলাহান্ট ডেস্ক: পাকিস্তানের (Pakistan) দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) প্রভাব এবার আর শুধু বাজারদর বা পরিসংখ্যানের মধ্যে আটকে নেই। সরাসরি বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের খাবারের থালা। সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে বহু পরিবারকে আগের তুলনায় কম খাবার কিনতে হচ্ছে, পাশাপাশি কমছে খাবারের মানও। রুটির আকার ছোট হচ্ছে, মাসে মাংস রান্নার সংখ্যা কমছে, শিশুদের জন্য দুধের পরিমাণেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এমনকি নিত্যদিনের চায়ের ক্ষেত্রেও অনেক পরিবারকে হিসেব করে চলতে হচ্ছে। অর্থাৎ, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সঙ্কট এখন মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে স্পষ্ট ছাপ ফেলছে।
পাকিস্তানের (Pakistan) সঙ্কট প্রসঙ্গে সামনে এল চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান:
পাকিস্তান (Pakistan) পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যেও এই পরিবর্তনের ছবি ধরা পড়েছে। গত ছয় বছরে শহর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের মাথাপিছু ব্যবহার কমেছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধারণ মানুষের আয় বা ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় সংসারের বাজেটে প্রথম কোপ পড়ছে খাবারের উপরেই। আগে যে পরিমাণ খাদ্যপণ্য একটি পরিবার সহজেই কিনতে পারত, এখন তা অনেকের কাছেই বিলাসিতা হয়ে উঠেছে। ফলে একই পণ্য কম পরিমাণে কেনা, অপেক্ষাকৃত সস্তা বিকল্প বেছে নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় খাবারও বাদ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
আরও পড়ুন: হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১,২২৫! সাহায্যের পরিবর্তে আমেরিকা-ভারত-চিন থেকে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পাকিস্তানের প্রায় ১৫.৯২ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে গুরুতর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। ২০২৫ সালের মধ্যে সেই হার ২৪.৩৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল। একই সময়ে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা পরিবারের হারও ২.৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু পেট ভরানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। পর্যাপ্ত ক্যালোরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চললে শিশুদের পুষ্টি, পরিবারের স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সামাজিক পরিস্থিতির উপরও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মজার বিষয় হল, পাকিস্তানের সমস্যা শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি নয়। দেশটি বিপুল পরিমাণে গম ও চাল উৎপাদন করে। হাঁস-মুরগি, ডিম, দুধ এবং মাংসও দেশের কৃষি ও খাদ্য অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমনকি পাকিস্তান থেকে মাংস বিদেশেও রপ্তানি হয়। কিন্তু উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের বড় অংশ সেই খাবার কিনতে পারছে না। অর্থনীতির মূল সঙ্কটটা তাই জোগানের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়। মূল্যবৃদ্ধি যখন পরিবারের মাসিক বাজেটের বড় অংশ গ্রাস করে নিচ্ছে, তখন খাবারের পরিমাণ ও গুণমান কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন বহু মানুষ।

আরও পড়ুন: কমল টাকা না পাওয়া আবেদনকারীদের চিন্তা! অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ফের বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের (Pakistan) পুরনো খাদ্য সঙ্কটের স্মৃতিকেও আবার সামনে এনে দিয়েছে। কয়েক বছর আগে গমের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির সময় সামাজিক মাধ্যমে ‘#BhookaNangaPakistan’ হ্যাশট্যাগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ সালের গমসঙ্কটের পরও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। এখন পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; সেই খাবার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখাও জরুরি। মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্কট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, অপুষ্টি এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতি পাকিস্তানের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।













