বাংলাহান্ট ডেস্ক: পরমাণু শক্তির (Nuclear Power) ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে এবার সমুদ্রের জলকে ইউরেনিয়ামের (Uranium) সম্ভাব্য উৎস হিসেবে কাজে লাগানোর দিকে এগোচ্ছে চিন (China)। চিনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশটির গবেষকরা সমুদ্রের জল থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের জন্য একটি বিশেষ উপাদান তৈরি করেছেন। এই প্রযুক্তি সফলভাবে বড় পরিসরে প্রয়োগ করা গেলে ভবিষ্যতে পরমাণু জ্বালানির জোগান বাড়ানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। স্থলভাগের খনি থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের পাশাপাশি সমুদ্রের বিপুল জলরাশিকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা খুলে যাওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও নজর কেড়েছে।
পরমাণু শক্তি বাড়াতে এবার সমুদ্রে লুকিয়ে থাকা ইউরেনিয়াম আহরণ করবে চিন (China):
চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর গবেষকদের তৈরি ওই বিশেষ উপাদানটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফসকেজ’। দেখতে অনেকটা স্পঞ্জের মতো এই আণবিক কাঠামোর মধ্যে থাকা ফসফেট রাসায়নিকভাবে ইউরেনিয়ামকে আটকে রাখতে পারে। ফলে সমুদ্রের জলে অত্যন্ত অল্প পরিমাণে মিশে থাকা ইউরেনিয়ামকে অন্য উপাদান থেকে আলাদা করে সংগ্রহ করার সুযোগ তৈরি হয়। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষাগারে সমুদ্রের জলের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে প্রতি গ্রাম ফসকেজ উপাদান থেকে সর্বোচ্চ ৫০.৪ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, এই ফল আমেরিকার পরীক্ষামূলক মানের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি (China)।
আরও পড়ুন: ১৭ লক্ষ আবেদন বাতিল! সেপ্টেম্বর মাসে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা ছাড়ার আগেই বড় আপডেট
সমুদ্রের জল থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হল এর অত্যন্ত কম ঘনত্ব। হিসাব অনুযায়ী, এক টন সমুদ্রের জলে ইউরেনিয়ামের পরিমাণ মাত্র প্রায় ৩.৩ মিলিগ্রাম। শুধু তাই নয়, একই জলের মধ্যে ভ্যানাডিয়ামের মতো আরও নানা উপাদান থাকায় নির্দিষ্টভাবে ইউরেনিয়ামকে আলাদা করে নেওয়া যথেষ্ট কঠিন। সেই সমস্যার সমাধান করতেই ফসকেজের মতো উপাদান তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর রাসায়নিক গঠন ইউরেনিয়ামকে তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষতায় আটকে রাখতে পারে বলেই গবেষকদের দাবি। তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফলকে বাস্তবে শিল্পস্তরে প্রয়োগ করতে গেলে উৎপাদন খরচ, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং বিপুল পরিমাণ সমুদ্রের জল প্রক্রিয়াকরণের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে।
এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা বোঝার জন্য সমুদ্রে থাকা ইউরেনিয়ামের পরিমাণের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, স্থলভাগে বিশ্বের মোট ইউরেনিয়াম মজুত প্রায় ৭৯ লক্ষ টন। তার তুলনায় মহাসাগরগুলিতে আনুমানিক ৪৫০ কোটি টন ইউরেনিয়াম ছড়িয়ে রয়েছে বলে দাবি করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির জলে শিলা ক্ষয় হয়ে তার বিভিন্ন উপাদান নদীর মাধ্যমে সমুদ্রে পৌঁছনোর ফলে এই বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম সাগরে জমা হয়েছে। অর্থাৎ সমুদ্রের জলে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কম হলেও মোট পরিমাণ অত্যন্ত বড়। এই কারণেই বহু বছর ধরে সমুদ্র থেকে ইউরেনিয়াম আহরণের প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে।

আরও পড়ুন: ডাল সেদ্ধ করার সময় ‘এই’ ভুল করছেন না তো? সব পুষ্টিই উধাও হয়ে যাচ্ছে!
শুধু মহাসাগর নয়, ভূমধ্যসাগরেও বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ওই জলভাগে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টন ইউরেনিয়াম থাকতে পারে। প্রচলিত হিসাবের ভিত্তিতে বলা হয়, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম বর্তমান বিশ্বের পারমাণবিক জ্বালানির চাহিদা দীর্ঘ সময়, এমনকি প্রায় ১৮০ বছর পর্যন্ত মেটানোর সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সমুদ্র থেকে ইউরেনিয়াম আহরণ এখনও গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে এবং পরীক্ষাগারের সাফল্য সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে পরিণত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। চিনের ‘ফসকেজ’ প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, সেটাই এখন দেখার। সফল হলে পরমাণু জ্বালানির উৎস নিয়ে বিশ্বের প্রচলিত ধারণায় অবশ্যই বড় পরিবর্তন আনতে পারে এই প্রযুক্তি (China)।













