বাংলাহান্ট ডেস্ক: চাকরির শুরুতেই এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে (Ajit Doval), যখন তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো এখানেই শেষ হয়ে গেল কেরিয়ার। বয়স তখন কুড়ির কোঠায়, সদ্য তরুণ আইপিএস (IPS) হিসেবে গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। সেই সময় সিকিমে দায়িত্বে ছিলেন ডোভাল। সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি চালানো এবং চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা PLA-র গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্প্রতি আইআইটি রুরকির সমাবর্তনে নিজের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে অজিত ডোভাল জানান, একটি গোয়েন্দা অভিযান কীভাবে তাঁকে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত—দুই দিক থেকেই গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
কর্মজীবনের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা জানালেন NSA অজিত ডোভাল (Ajit Doval):
ডোভালের (Ajit Doval) কথায়, একবার সীমান্তবর্তী এলাকায় তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি দল পাঠিয়েছিলেন তিনি। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দলের কোনও সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। দিন যত গড়াতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে উদ্বেগ। তাঁরা কোনও দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন কি না, পাহাড়ে তুষারধসে আটকে গিয়েছেন কি না—কিছুই জানা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সদর দফতর থেকেই ডোভালের কাছে ফোন আসে। জানতে চাওয়া হয়, তিনি কি সীমান্তের ওপারে লোক পাঠিয়েছিলেন। তখনই জানা যায়, ওই দলটি চিনা সেনার হাতে ধরা পড়েছে এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: একী কাণ্ড! পড়ুয়াদের কাছে মাদকদ্রব্য সরবরাহ খোদ শিক্ষকের, কড়া অ্যাকশন পুলিশের
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন ডোভাল জানতে পারেন, তাঁর পাঠানো দলের সদস্যরা চিনের হেফাজতে রয়েছেন। পরে কথাবার্তা বা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল বলে ডোভাল জানান। কিন্তু ফিরে আসার পর তাঁদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। তাঁর বর্ণনায়, তাঁরা মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। এই ঘটনার পরই শুরু হয় তদন্ত। এত কম বয়সে গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডোভালের কাছে পরিস্থিতিটি কার্যত দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছিল। তিনি মনে করেছিলেন, এত বড় একটি ঘটনার জন্য হয়তো তাঁর চাকরি এবং গোটা কেরিয়ারই শেষ হয়ে যাবে। এমনকী গোয়েন্দা বিভাগে আর কাজ করতে না পারলে ভবিষ্যতে কী করবেন, তা নিয়েও ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি।
তবে তদন্তের ফলাফল শেষ পর্যন্ত ডোভালের আশঙ্কার মতো হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে তাঁকে ওই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়নি। বরং জানা যায়, সদর দফতর থেকে অভিযানে ব্যবহারের জন্য দেওয়া কিছু নকশা ও মানচিত্রে ভুলত্রুটি ছিল। সেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল বলে ডোভাল জানান। তিনি নিজেও সেই সময়ের সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত অপেশাদার বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু তদন্তের পরে বিষয়টি অন্যভাবে সামনে আসে। ডোভাল বলেন, সেই সময় তিনি অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং মনে হচ্ছিল, জীবনের সবকিছু যেন ভুল পথে চলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন : দেশের ৫১,০০০ যুবক-যুবতী পেলেন চাকরি! রোজগার মেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী
সেই কঠিন সময়েই তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এক প্রবীণ তিব্বতি শেরপার। বরফে ঢাকা পাহাড়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ওই শেরপা ডোভালকে জীবনের একটি সহজ অথচ গভীর শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, জীবন অনেকটাই মানচিত্র পড়ার মতো—প্রথমে জানতে হবে, আপনি এখন কোথায় রয়েছেন; তারপর ঠিক করতে হবে, কোথায় পৌঁছতে চান; এবং সবশেষে বুঝতে হবে, সেখানে পৌঁছনোর সঠিক পথ কোনটি। সম্ভব হলে ফেরার পথটাও জানা থাকা দরকার। ডোভালের (Ajit Doval) মতে, সেই কথাগুলি তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বহু বছর পর আইআইটি রুরকির মঞ্চে দাঁড়িয়েও সেই শিক্ষাই তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন তিনি—জীবনে কঠিন সময় আসতেই পারে, কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পথ ঠিক করাটাই আসল।













