বাংলা হান্ট ডেস্ক : ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে না চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। জাতীয় গানকে ঘিরে কেন্দ্রের সংশোধিত আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ।
বড় পর্যবেক্ষণ সুপ্রিমকোর্টের (Supreme Court)
সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, গানটির কোন অংশ গাওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কোনও ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না। মামলাটি দায়ের করেছেন কন্নড় গায়ক টিএম কৃষ্ণ। তাঁর আপত্তি মূলত ‘বন্দে মাতরম’-এর কয়েকটি স্তবককে ঘিরে। তাঁর বক্তব্য, গানটির শেষ চারটি স্তবকে দুর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর মতো হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। ফলে কোনও ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ওই অংশ গাইতে আপত্তি জানালে তাঁকে বাধ্য করা সংবিধানস্বীকৃত ধর্মাচরণের স্বাধীনতার পরিপন্থী হতে পারে বলে আদালতের সামনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এই আইনি বিতর্কের সূত্রপাত কেন্দ্রের সাম্প্রতিক সংশোধনী থেকেই। গত জুলাইয়ে সংসদে জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাশ হয়। এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত ব্যবস্থায় জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’-এর পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’-কেও বিশেষ আইনি মর্যাদার আওতায় রাখা হয়েছে।
আগের আইনে জাতীয় পতাকা, সংবিধান কিংবা জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত। এই ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত জেলের বিধান রয়েছে। নতুন সংশোধনীর পর ‘বন্দে মাতরম’-কেও সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মামলাকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি অনুষ্ঠানে ‘জনগণমন’-এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ না গাইলেও সংশোধিত আইনের আওতায় শাস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই জায়গাতেই ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে এনেছে মামলা। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, আদালত আপাতত ‘বন্দে মাতরম’ সম্পূর্ণ গাওয়া উচিত, নাকি নির্দিষ্ট কয়েকটি স্তবক গাওয়া উচিত—সেই বিতর্কে ঢুকছে না। বরং কোনও নাগরিকের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, সেটিই বিচারাধীন বিষয়।
শুনানিতে বেঞ্চের তরফে বলা হয়েছে, “আদালত প্রত্যাশা করে যে ধর্মীয় কারণে বন্দে মাতরম না গাইলে কাউকে শাস্তি পেতে হবে না।”
এই প্রসঙ্গে ১৯৮৬ সালের ‘বিজয় ইমানুয়েল’ মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করেছে শীর্ষ আদালত। ওই মামলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিয়ে নাগরিকের অধিকারের প্রশ্ন উঠেছিল এবং ধর্মপালনের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। বর্তমান মামলাতেও সেই রায়ের নীতিগুলি কার্যকর হবে কি না, সেটাই এখন খতিয়ে দেখছে আদালত।

আরও পড়ুন : পুজোর আগে LPG-তে দাম কমার ইঙ্গিত, কলকাতা-সহ চার শহরে আজ কত দর?
‘বন্দে মাতরম’-এর স্তবক সংখ্যা নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে বেঞ্চ জানিয়েছে, “আমরা আশা করব, বিজয় ইমানুয়েল মামলার রায় মেনে চলা হবে।” দুই সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রকে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে সংশোধিত জাতীয় সম্মান আইনের বিধান এবং সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের মধ্যে আইনি সামঞ্জস্য কী ভাবে নির্ধারিত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশবাসী।














