বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতের প্রসাধনী বাজারে ভিকোর নাম উঠলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত জিঙ্গেল—‘ভিকো (Vicco) টারমারিক নেহি কসমেটিক…’। ৮০ ও ৯০-র দশকে টেলিভিশনের পর্দায় এই বিজ্ঞাপন একসময় কার্যত ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ভিকোর সাফল্যের গল্প (Success Story) শুধু জনপ্রিয় একটি বিজ্ঞাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পিছনে রয়েছে আয়ুর্বেদের উপর ভরসা, ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পণ্যের যোগ এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিপণনের কৌশল। ১৯৫২ সালে বম্বে অর্থাৎ বর্তমানের মুম্বইয়ের (Mumbai) একটি সাধারণ চওল থেকে যাত্রা শুরু করে সংস্থাটি ধীরে ধীরে পরিচিত আয়ুর্বেদিক পণ্য প্রস্তুতকারক হয়ে ওঠে। বিশ্বায়ন ও আধুনিক প্রসাধনীর দাপটের মধ্যেও নিজেদের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে কীভাবে বাজারে জায়গা ধরে রাখতে হয়, ভিকোর যাত্রা তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বিখ্যাত আয়ুর্বেদিক ক্রিমের ব্র্যান্ড ভিকোর অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
ভিকোর প্রতিষ্ঠাতা কে ভি পেন্ধারকর ১৯৫২ সালে বিষ্ণু ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থার নাম থেকেই তৈরি হয় ‘ভিকো’ ব্র্যান্ড। প্রথম দিকে আয়ুর্বেদিক পণ্যের উপর জোর দিয়েই বাজারে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলে সংস্থাটি। ১৮টি ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি ভিকো বজ্রদন্তী টুথপেস্ট ক্রেতাদের কাছে পরিচিতি পাওয়ার পর ত্বকের পরিচর্যার বাজারেও নজর দেয় সংস্থা। সেই ভাবনা থেকেই আসে ভিকো টারমারিক আয়ুর্বেদিক ক্রিম। তখন ফর্সা ও উজ্জ্বল ত্বকের জন্য নানা ধরনের ক্রিমের চল থাকলেও মুখে হলুদ রঙের ক্রিম মাখতে অনেকেই দ্বিধা করতেন। সেই বাধা কাটাতে বিক্রয়কর্মীরা দোকানে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সামনে সরাসরি ক্রিম ব্যবহার করে দেখাতেন। পণ্যটির ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য বোঝানোর এই অভিনব কৌশল ভিকোর বাজার তৈরিতে সাহায্য করেছিল (Success Story)।
তবে ভিকোকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয় বিজ্ঞাপন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে দূরদর্শনের পর্দায় প্রচারিত সংস্থার বিজ্ঞাপন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রযোজক এস এস ওবেরয়ের সহযোগিতায় তৈরি একটি বিজ্ঞাপনে হবু বধূর ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল প্রাক্তন মিস ইন্ডিয়া সঙ্গীতা বিজলানিকে। বিয়ের আগে হলুদ মাখার ভারতীয় রীতিকে কেন্দ্র করে তৈরি সেই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে জুড়ে যায় ‘ভিকো টারমারিক নেহি কসমেটিক…’ জিঙ্গেলটি। পরিচিত সুর ও সহজে মনে রাখার মতো কথার কারণে বিজ্ঞাপনটি মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। পাশাপাশি, সংস্থার তরফে জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান স্পনসর করা এবং ভিডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দেওয়ার মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ফলে ভিকোর প্রচার শুধু পণ্যের গুণাগুণের মধ্যে আটকে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও একটি পরিচিত অংশ।
ভিকোর ব্যবসায়িক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭৮ সালের আইনি বিরোধ। কেন্দ্রীয় আবগারি বিভাগের সঙ্গে সংস্থার মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল ভিকো বজ্রদন্তী ও ভিকো টারমারিকের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে। পণ্যগুলিকে আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, নাকি প্রসাধনী হিসেবে গণ্য করা হবে, তা নিয়েই শুরু হয় বিতর্ক। সংস্থা আদালতের দ্বারস্থ হয় এবং ১৯৮২ সালে দেওয়ানি আদালতের রায় তাদের পক্ষে যায় বলে সংস্থার ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। এই ঘটনাকে পরবর্তী সময়ে বিপণনের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেয় ভিকো। ‘কসমেটিক নয়, আয়ুর্বেদিক ক্রিম’—এই পরিচয়কে সামনে রেখে ব্র্যান্ডটি নিজেদের অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলে ধরে। তবে এই আইনি বিরোধ ও তার রায়ের নির্দিষ্ট পরিসর নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানে মুছল ইমরান সরকারের শেষ চিহ্ন! খাইবার পাখতুনখোয়ায় লাগু ইমার্জেন্সি
বর্তমানে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার, ডাবর ও হিমালয়ার মতো সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যেও ভিকো নিজেদের পরিচিতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। সংস্থাটির বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-সহ ৩৫টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির কথাও জানানো হয়েছে। সময়ের সঙ্গে ক্রেতাদের চাহিদা বদলানোর বিষয়টি মাথায় রেখে ক্রিমের পাশাপাশি শেভিং ক্রিম, সানস্ক্রিন ও ফেসওয়াশের মতো পণ্যও বাজারে এনেছে সংস্থাটি। নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছতে সামাজিক মাধ্যম ও ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে। আধুনিক বিপণনের এই পরিবর্তনের মধ্যেও ভিকোর সবচেয়ে বড় সম্পদ রয়ে গিয়েছে তার পরিচিত নাম, হলুদের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির যোগ এবং কয়েক দশক ধরে মানুষের মনে গেঁথে থাকা সেই জিঙ্গেল (Success Story)।














