বাংলা হান্ট ডেস্ক: আজকে এমন এক সাফল্যের কাহিনি (Success Story) বলব যেখানে দায়িত্ব বা কর্তব্যপালনের মাধ্যমে কিভাবে সফলতা অর্জন করা যায় তার প্রমাণ রয়েছে। মাত্র ২০ বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল তাঁকে। স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগ দেওয়ার। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন ব্যবসা। কখনও সেলাইয়ের সরঞ্জাম, কখনও রেনকোট, আবার কখনও মরসুমি আতশবাজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এমন একটি ব্যবসা গড়ে তোলার ইচ্ছা ছিল, যার চাহিদা থাকবে সারা বছর। সেই ভাবনা থেকেই একসময় আইসক্রিমের ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নেন এস. প্রভাকর কামাথ (S. Prabhakar Kamath)। কে জানত, তাঁর এই সিদ্ধান্তই একদিন বদলে দেবে তাঁর জীবন এবং তৈরি করবে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম পরিচিত আইসক্রিম ব্র্যান্ড আইডিয়াল আইসক্রিম (Ideal Icecream)!
এস. প্রভাকর কামাথের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
শুরুটা অবশ্য মোটেই সহজ ছিল না। প্রথমে তৈরি আইসক্রিম বিক্রির জন্য একটি ফ্রিজার কিনেছিলেন প্রভাকর। কিন্তু আইসক্রিম সরবরাহ করার মতো কোনও ডিলার খুঁজে পাননি। শেষ পর্যন্ত নিজেই আইসক্রিম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। বাড়িতে নানা ধরনের উপকরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন তিনি। তৈরি করা আইসক্রিমের স্বাদ কেমন হয়েছে, তা বোঝার জন্য প্রতিবেশীদেরও খাওয়াতেন। ধীরে ধীরে নিজের অভিজ্ঞতা ও চেষ্টায় আইসক্রিম তৈরির কৌশল রপ্ত করেন। তাঁর ছেলে মুকুন্দ কামাথও এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তৈরি আইসক্রিমের সরবরাহকারী না পেয়ে তাঁর বাবা নিজেই এই ব্যবসার ভিত গড়ে তোলার পথে হাঁটেন। এভাবেই শুরু হয় এক নতুন যাত্রা (Success Story)।
আরও পড়ুন: বড় সমস্যা মিটলো ভারতীয় দলের! হার্দিক পান্ডিয়ার অভাব ঢাকতে দুই ক্রিকেটারকে কাজে লাগাবেন গম্ভীর
১৯৭৫ সালের ১ মে কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালুরুর মার্কেট রোডে আইডিয়াল আইসক্রিমের প্রথম পার্লার খোলেন প্রভাকর কামাথ। সেখানে শুরুতে প্রায় ১৪ ধরনের আইসক্রিম পাওয়া যেত। স্বাদ, গুণমান এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম—এই তিনের মেলবন্ধন অল্প সময়ের মধ্যেই ক্রেতাদের মন জয় করে নেয়। মাত্র দু’বছরের মধ্যে পার্লারের সামনে গ্রাহকদের লম্বা লাইন পড়তে শুরু করে। ক্রমে ম্যাঙ্গালুরুর মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে এই ব্র্যান্ড। আইডিয়াল আইসক্রিমের সঙ্গে জড়িয়ে যায় শহরের বিখ্যাত ‘পাব্বাস’ আইসক্রিম পার্লারের নামও। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া ব্যবসা যে একদিন এত বড় আকার নেবে, তা হয়তো সেই সময় ভাবেননি প্রভাকর নিজেও।
তবে প্রতিষ্ঠাতার হাত ধরে তৈরি হওয়া এই ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তাঁর ছেলে মুকুন্দ কামাথ। ২০০১ সালে আইডিয়াল আইসক্রিম খুচরো বাজারে নিজেদের পণ্য সরবরাহ শুরু করে। ফলে শুধুমাত্র পার্লারের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দোকান এবং অন্য শহরের ক্রেতাদের কাছেও পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সংস্থার সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কর্ণাটক, কেরল ও গোয়া জুড়ে আইডিয়াল আইসক্রিমের ৮,৫০০-রও বেশি খুচরো বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। প্যাকেটজাত আইসক্রিম, ক্যান্ডি, কোন, সানডে থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফলের স্বাদের আইসক্রিম—সব মিলিয়ে সংস্থার পণ্যসম্ভারে রয়েছে ১৫০টিরও বেশি পণ্য।

আরও পড়ুন:গালওয়ানের পর ফের সংঘাতের আশঙ্কা? অরুণাচল নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, কি বলছে বিদেশ মন্ত্রক
একটি ছোট পার্লার থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবসা এখন বড় আর্থিক সাফল্যেরও নজির। ট্র্যাক্সনের আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে আইডিয়াল আইসক্রিমের রাজস্বের পরিমাণ ছিল ১৫৩.২ কোটি টাকা। ওই অর্থবর্ষে সংস্থার নিট মুনাফা হয়েছে ১৬.৭ কোটি টাকা। তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে যাঁর স্বপ্ন ও পরিশ্রম, সেই প্রভাকর কামাথ ২০২১ সালে ম্যাঙ্গালুরুতে একটি স্কুটার দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান। ‘আইডিয়াল পাব্বা’ নামে পরিচিত এই মানুষটি আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর তৈরি ব্যবসা এখনও এগিয়ে চলেছে পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন তিনি, তা আজ হাজার হাজার বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে গিয়েছে। প্রভাকর কামাথের জীবন তাই শুধু একটি ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প (Success Story) নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নতুন পথ খুঁজে নেওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।














