বাংলাহান্ট ডেস্ক: ব্রাজিলের (Brazil) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে বাজিমাত করলেন বামপন্থী নেতা লুলা দ্য সিলভা (Lula da Silva)। প্রথম দফার ভোটে কোনও প্রার্থীই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত রানঅফে গড়িয়েছিল নির্বাচনী লড়াই। রবিবারের দ্বিতীয় দফার ভোটেই সেই অনিশ্চয়তা কাটল। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারোর পুত্র তথা দক্ষিণপন্থী লিবারেল পার্টির প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে (Flavio Bolsonaro) পরাজিত করে ফের ব্রাজিলের ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এলেন ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা লুলা। এই জয়ের ফলে চতুর্থবারের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পথে তিনি। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলে এই ফলাফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের মধ্যেই ব্রাজিলে বামপন্থী নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিল এই নির্বাচন।
ব্রাজিলে (Brazil) ইতিহাস গড়ে চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন লুলা দ্য সিলভা:
প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ব্রাজিলে (Brazil) প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়েছিল। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও প্রার্থীই অর্জন করতে পারেননি। ফলে নিয়ম মেনে দ্বিতীয় দফার ভোটের আয়োজন করা হয়। প্রথম দফায় লুলার তুলনায় কিছুটা এগিয়ে ছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় সেই ব্যবধানের ছবিটা বদলে যায়। ভারতীয় সময় সোমবার ভোর থেকেই ভোটগণনার প্রবণতা সামনে আসতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লুলার জয়ের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ওয়ার্কার্স পার্টির শক্তিশালী জনসমর্থন লুলার জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৫১ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ফলাফলের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান সামনে এলে নির্বাচনী সমীকরণের বিস্তারিত ছবি আরও পরিষ্কার হবে।
আরও পড়ুন: একাধিক গাড়ির মধ্যে সংঘর্ষ! পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনার শিকার রাহুল গান্ধীর কনভয়
এবারের নির্বাচনে ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দেশের রফতানিনীতি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রাজিলের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখা নিয়েও জোরালো আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটনের প্রভাব কতটা থাকবে, তা ছিল নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাইর বলসোনারো এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতার কথা পরিচিত। অন্যদিকে, লুলার প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছিল ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। সেই প্রেক্ষাপটে লুলার জয়কে শুধু একটি নির্বাচনী ফলাফল হিসেবে নয়, ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিশার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
লুলার রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতনও কম নয়। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জাইর বলসোনারোর শাসনকালে দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি হতে হয়েছিল তাঁকে। তবে আইনি লড়াইয়ের পর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ২০২৩ সালে ফের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন লুলা। এবার নির্বাচনে জয়ী হলে তাঁর চতুর্থবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের নজির তৈরি হবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর সমর্থন উল্লেখযোগ্য ছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত বয়সি ভোটারদের একটি বড় অংশ লুলার দিকে ঝুঁকেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ফলে পুরনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের সমর্থনের মেলবন্ধন তাঁর জয়ের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: পুজোর পর পাহাড়ে যাওয়ার প্ল্যান? অবশ্যই ঘুরে দেখুন দার্জিলিংয়ের এই জায়গাগুলি
তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ভোটগণনা শেষ হওয়ার পর ফলাফলকে স্বচ্ছ বলে মেনে নিতে নারাজ তিনি। তাঁর অভিযোগ, ভোটদানের সময়সীমা শেষ মুহূর্তে বাড়ানো হয়েছিল, যা অনৈতিক এবং ব্রাজিলের মানুষের প্রকৃত রায়কে প্রতিফলিত করে না। সেই কারণে ফলাফল বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তিনি। যদিও তাঁর এই অভিযোগের সমর্থনে কী প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ব্রাজিলের (Brazil) নির্বাচনে লুলার জয় লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে দক্ষিণপন্থী শিবিরের পরাজয়, অন্যদিকে বামপন্থী নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন—এই দুইয়ের প্রভাব আগামী দিনে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা পড়ে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে বিশ্বের।














