বাংলা হান্ট ডেস্ক: বড় স্বপ্নপূরণের জন্য বা সফলতা (Success Story) অর্জন করতে সব সময় দামি কোচিং সেন্টার কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় অদম্য জেদ, সঠিক পরিকল্পনা আর কঠোর পরিশ্রমের। সেই কথাই যেন প্রমাণ করে দিয়েছেন আইএএস অফিসার যতীন কুমার (Jatin Kumar)। রাজস্থানের (Rajasthan) আলওয়ার জেলার একটি ছোট গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসে সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। তাও আবার কোনও নামী কোচিং প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়াই, শুধুমাত্র ইউটিউবের মতো অনলাইন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে। একটা সময় ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া-তে সরকারি চাকরি করতেন যতীন। কিন্তু মনের মধ্যে ছিল প্রশাসনিক আধিকারিক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নপূরণের জন্য নিরাপদ চাকরি ছাড়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ২০২৩ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় মেধাতালিকায় ৩৬৪তম স্থান অর্জন করে আইএএস হওয়ার পথ প্রশস্ত করেন।
যতীন কুমারের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
যতীনের এই সাফল্যের (Success Story) পিছনে রয়েছে সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসার লড়াই। রাজস্থানের আলওয়ার জেলার একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা তাঁর। ছোটবেলায় কোনও অভিজাত স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি তিনি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামের সরকারি স্কুলেই পড়াশোনা করেন। পরে আলওয়ারে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। দ্বাদশ শ্রেণিতে জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও কলেজে রসায়নে অনার্স বেছে নেন যতীন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। সহপাঠীদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতেন। ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফলে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলনেও অংশ নেন। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মাথা মুড়িয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তাঁর এই পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যায়, ছাত্রজীবন থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার মানসিকতা ছিল তাঁর মধ্যে।
কলেজের পড়াশোনা শেষ করার পর ২০১৭ সালেই ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ায় চাকরি পান যতীন। সাধারণ পরিবারের কাছে এই ধরনের সরকারি চাকরি নিঃসন্দেহে বড় প্রাপ্তি। কিন্তু সেই সাফল্যেও থেমে থাকেননি তিনি। চাকরির পাশাপাশি দূরশিক্ষার মাধ্যমে ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। একই সঙ্গে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিও শুরু করেন। ২০২১ সালে প্রথমবার পরীক্ষায় বসে প্রিলিমিনারি পর্বেই আটকে যান। প্রথম প্রচেষ্টায় ব্যর্থতা তাঁকে হতাশ করেছিল ঠিকই, কিন্তু স্বপ্ন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজের প্রস্তুতির পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে তাঁর বড় ভাই, তাঁকে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেন। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে ইউপিএসসি প্রস্তুতিতে মন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যতীন।
তবে চাকরি ছেড়ে প্রস্তুতি শুরু করলেও ব্যয়বহুল কোচিং সেন্টারে ভর্তি হননি তিনি। পরিবর্তে ইউটিউবকেই নিজের পড়াশোনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম করে তোলেন। বিভিন্ন বিষয়ের ভিডিও, সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলির আলোচনা দেখে নিজের নোট তৈরি করতেন। সংবাদপত্র বা পত্রিকা নিয়মিত পড়ার বদলে অনলাইনেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতেন বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বিগত বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান, নিয়মিত লেখার অনুশীলন এবং বারবার রিভিশনের উপর জোর দিয়েছিলেন। বড় বড় নোট তৈরি না করে ছোট ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ নোট বানাতেন, যাতে পরীক্ষার আগে দ্রুত বিষয়গুলি ঝালিয়ে নেওয়া যায়। তাঁর প্রস্তুতির মূলমন্ত্র ছিল, শুধু বেশি পড়া নয়, যা পড়া হচ্ছে তা কতটা বোঝা গেল এবং পরীক্ষায় কতটা কার্যকরভাবে লেখা যাচ্ছে, সেটাই আসল।

কঠোর পরিশ্রম, পরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং পরিবারের সমর্থন শেষ পর্যন্ত সাফল্য এনে দেয় যতীনকে। দ্বিতীয় প্রচেষ্টাতেই ২০২৩ সালের ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ৩৬৪তম স্থান অর্জন করেন তিনি। তাঁর এই যাত্রা প্রমাণ করে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সঠিক কৌশল এবং ধারাবাহিক অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বড় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। যতীনের মতে, ইউপিএসসি পরীক্ষায় সাফল্য (Success Story) শুধু কতগুলি বই পড়া হয়েছে, তার উপর নির্ভর করে না; বরং কোনও বিষয় কতটা গভীরভাবে বোঝা হয়েছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আজ তাঁর কাহিনি সেই সমস্ত তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা, যাঁরা আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা উপযুক্ত সুযোগের অভাবের কারণে নিজেদের স্বপ্নপূরণ নিয়ে সংশয়ে ভোগেন। যতীনের সাফল্য তাঁদের মনে করিয়ে দেয়, পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও লক্ষ্য স্থির থাকলে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া যায়।












