বাংলা হান্ট ডেস্ক : ভোটের ময়দানে সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা দলীয় বিবাদের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। তাঁদের মৃত্যুর পর পরিবারগুলির জীবনে নেমে এসেছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। এবার সেই পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) ঘোষণা অনুযায়ী, গত আড়াই দশকে রাজনৈতিক হিংসায় মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারের জন্য বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর (Suvendu Adhikari)
এই সুযোগ কারা পাবেন, তা নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক স্তরে আবেদন সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে একজন সদস্যকে চাকরির জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসনের উপর। পরিবারের পরিচয়, মৃত্যুর ঘটনা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হবে। জেলা স্তরে সেই নথি যাচাই ও সংকলনের পর নবান্নে পাঠানো হবে। এরপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারের এই ঘোষণাকে রাজনৈতিক হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে ব্যাখ্যা করেছেন বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘর্ষের শিকার পরিবারগুলি যথাযথ সহায়তা পায়নি। তিনি বলেন, “রাজ্যের মানুষ জানেন, গত ২৫ বছরে কীভাবে ভোটের নামে বাংলায় অত্যাচার হয়েছে। ভোট পরবর্তী হিংসায় খুন হয়ে যাওয়া যেন নিউ নর্মাল হয়ে গিয়েছে। রক্তপাতহীন এবারও হয়েছে। অতীতে যাঁদের রক্ত হয়েছে, তাঁদের কাছে সরকারের এই ঘোষণা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
তবে এই সিদ্ধান্তের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর প্রশ্ন, বাম আমলের নির্দিষ্ট দশ বছরকে কেন এই হিসাবের মধ্যে রাখা হচ্ছে? পাশাপাশি, কোনও ব্যক্তির পরিবারের সদস্যকে সরাসরি সরকারি চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হবে, তা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন তিনি। বিকাশরঞ্জনের বক্তব্য, এই ঘোষণার আড়ালে রাজনৈতিক কর্মীদের চাকরি দেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে। তিনি বলেন, “হঠাৎ বাম জমানার ১০ বছর কেন হল? এর যুক্তি কোথায়? সরকারি চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে কমপেনসেট চাকরি তো হয়। কিন্তু আসলে ওরা চাইছে ঘুরপথে বিজেপি কর্মীদের চাকরি দিতে। কারণ ১৫ বছরে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁরা তো সব বিজেপি কর্মী হয়ে গিয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মূলত বিচার বিবেচনা হওয়া উচিত, প্রশাসনের সুবিধা। এটার মধ্যে কোনওরকম সাংবিধানিক নৈতিকতার চিহ্ন আমি দেখতে পাচ্ছি না।”
এদিকে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক হিংসায় নিহত অভিজিৎ সরকারের পরিবারের তরফে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। তাঁর দাদা বিশ্বজিৎ সরকারের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা হলেও প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা সব পরিবারের কাছেই সমান। তাঁর বক্তব্য, বাম আমলের ঘটনাগুলিকেও বিবেচনায় রাখার সিদ্ধান্ত এই ঘোষণাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক হিংসায় মৃত্যু, সে যে দলেরই হোক না কেন, তার পরিবার জানে কতটা কষ্টের! সেই কষ্ট এই মুখ্যমন্ত্রী বুঝেছেন। তাই কেবল তৃণমূল জমানার নয়, বাম জমানাকেও হিসাবে ধরেছেন। এটা সত্যিই ভালো উদ্যোগ।”চাকরির ঘোষণা সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে দাবি পাল্টা দাবি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আর্থিক নিরাপত্তার সুযোগ তৈরি হবে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা চলছে। এই ঘোষণাটি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, তার উপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য।