বাংলাহান্ট ডেস্ক: ব্যাঙ্কের টাকা হাতাতে এবার হ্যাকারদের নয়া হাতিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence)! শুধু সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নয়, সরাসরি ব্যাঙ্ক, নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল কোম্পানি (NBFC) এবং ফিনটেক সংস্থাগুলিকেও নিশানা করছে সাইবার (Cyber Fraud) অপরাধীরা। অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির সাহায্যে কার্যত মেশিনের গতিতে চালানো হচ্ছে এই হামলা। এর জেরে কয়েকটি ক্ষেত্রে পেমেন্ট এবং টাকা বিতরণের ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকার অননুমোদিত লেনদেনের ঘটনাও সামনে এসেছে। বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ইন্ডিয়ান সাইবারক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার (I4C)-এর ন্যাশনাল সাইবারক্রাইম থ্রেট অ্যানালাইসিস ইউনিট (NCTAU) এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীন CERT-In যৌথভাবে এই নতুন ধরনের সাইবার হামলার প্রবণতা চিহ্নিত করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাঙ্ক, NBFC এবং ফিনটেক সংস্থাগুলির জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক নির্দেশিকা জারি করেছে I4C।
AI এজেন্টদের মাধ্যমে সাইবার জালিয়াতি (Cyber Fraud) রুখতে অ্যাডভাইজারি জারি কেন্দ্রের:
কীভাবে চলছে এই সাইবার জালিয়াতি (Cyber Fraud)? জানা গিয়েছে, হ্যাকাররা প্রথমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির ইন্টারনেট সংযুক্ত সার্ভার এবং আইটি ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলি খুঁজে বের করছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন আপডেট না করা সফটওয়্যার কিংবা ভুলভাবে কনফিগার করা সিস্টেম তাদের প্রধান নিশানা। এমনকি গ্রাহকদের অভিযোগ জানানোর অনলাইন ব্যবস্থাকেও কাজে লাগানো হতে পারে। একবার কোনওভাবে সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারলেই অপরাধীরা স্বয়ংক্রিয় টাকা বিতরণ ব্যবস্থা এবং পেমেন্টের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ API-গুলিকে নিশানা করছে। এর ফলে প্রকৃত অনুমোদন ছাড়াই বিপুল অঙ্কের টাকা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘এজেন্টিক এআই ফ্রেমওয়ার্ক’। অর্থাৎ, এআই এজেন্টের সাহায্যে খুব অল্প সময়ে একাধিক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই হামলা অনেক বেশি দ্রুত এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: পথকুকুরদের খাওয়াতে ডগ ফিডিং জোন! পশুদের হাসপাতাল ও শ্মশান তৈরিরও ঘোষণা অগ্নিমিত্রার
জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকা কোথায় যাচ্ছে, সেই কৌশলও বেশ পরিকল্পিত। প্রথমে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের মিউল অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করছে হ্যাকাররা। সাধারণত অপরাধমূলক কাজে অবৈধভাবে টাকা লেনদেনের জন্য এই ধরনের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকে IMPS অথবা NEFT-এর মাধ্যমে দ্রুত অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রতারণা ধরা পড়ার আগেই টাকা হাতছাড়া হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, লেনদেনের পর ডিজিটাল রেকর্ড মুছে ফেলে নিজেদের চিহ্ন লোপাটের চেষ্টাও করছে অপরাধীরা। এর ফলে তদন্তকারী সংস্থাগুলির পক্ষে হামলার উৎস খুঁজে বের করা এবং টাকা কোন পথে সরানো হয়েছে, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্র।
নিরাপত্তা জোরদার করতে ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য আর্থিক সংস্থাগুলিকে একাধিক পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পেমেন্টের কাজে ব্যবহৃত সমস্ত API-এর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। পুরনো, অব্যবহৃত কিংবা পরীক্ষামূলক অবস্থায় থাকা ইন্টারফেসগুলি অবিলম্বে বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দৈনিক লেনদেন এবং প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা বেঁধে দিতে হবে। টাকা পাঠানোর আগে সুবিধাভোগীর নাম ও অ্যাকাউন্টের তথ্য যাচাই করাও জরুরি। কোনও লেনদেনের পরিমাণ, গ্রাহকের প্রোফাইল কিংবা লেনদেনের ধরনে হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে তা দ্রুত খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যাঙ্কের সাইবার নিরাপত্তা আধিকারিক, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং টিমকে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অননুমোদিত IP ঠিকানা থেকে অ্যাক্সেস টোকেন ব্যবহার করে যাতে কোনও সংস্থার সিস্টেমে প্রবেশ করা না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। KYC-সহ প্রয়োজনীয় যাচাই এবং অনুমোদন সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত টাকা স্থানান্তরও বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ২৫০ টাকার স্মারক মুদ্রা প্রকাশ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের! কীভাবে করবেন সংগ্রহ?
এখানেই শেষ নয়, সাইবার হামলার ঘটনা শনাক্ত হওয়ার ছয় ঘণ্টার মধ্যে CERT-In-কে রিপোর্ট করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে। ব্যাঙ্ক এবং NBFC-গুলিকে একই সময়সীমার মধ্যে RBI-এর DAKSH পোর্টালে ঘটনার বিস্তারিত জানাতে হবে। অন্যদিকে, NBFC ও ফিনটেক সংস্থাগুলি প্রতারণামূলক লেনদেনের একাধিক তথ্য একসঙ্গে জানানোর জন্য I4C-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। এর মাধ্যমে দ্রুত সন্দেহজনক টাকা চিহ্নিত করে তা আটকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি অনুমোদিত রেড-টিম মহড়ার মাধ্যমে এআই-নির্ভর দ্রুতগতির সাইবার হামলার অনুকরণ করে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (SOC) এবং পেমেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কত দ্রুত হামলা শনাক্ত করে প্রতিরোধ করতে পারে, তা যাচাই করতে হবে। সব মিলিয়ে, এআইয়ের অপব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতির নতুন প্রবণতা ঠেকাতে ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন আনার বার্তা দিয়েছে কেন্দ্র (Cyber Fraud)।












