বাংলা হান্ট ডেস্ক : বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance) নিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ ছড়াল নবান্নের সাম্প্রতিক ঘোষণাকে ঘিরে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিএ মেটানোর কথা জানালেও সরকারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কর্মচারী সংগঠনগুলির একাংশ। বিশেষত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং বিভিন্ন সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পাওনা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
বকেয়া ডিএ(Dearness Allowance) নিয়ে অসন্তোষ কর্মীদের মধ্যে
ফলে একাংশের মতে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণায় সমস্যার আংশিক সমাধান হলেও বহু কর্মীর বকেয়া পাওয়ার বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত। বুধবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করতেই এই আর্থিক বরাদ্দের সিদ্ধান্ত। কিন্তু কর্মচারী সংগঠনগুলির দাবি, ঘোষিত অর্থের সঙ্গে মোট বকেয়ার হিসাবের বিস্তর ফারাক রয়েছে।

বিশেষ করে গ্রান্ট-ইন-এইডের আওতায় থাকা কর্মীদের পাওনা কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে সরকার এখনও স্পষ্ট কোনও পরিকল্পনা জানায়নি। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরা। কর্মচারী সংগঠনগুলির দাবি, সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের বকেয়া মেটাতে আনুমানিক ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। অথচ মুখ্যমন্ত্রী বারবার ডিসেম্বর মাসে ইন্দু মলহোত্র কমিটির বৈঠকের কথা উল্লেখ করছেন।
আরও পড়ুন : দিওয়ালির আগেই ঢুকবে অন্নপূর্ণা যোজনার নভেম্বর কিস্তি! দিনক্ষণ জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী
কর্মচারী প্রতিনিধিদের প্রশ্ন, ওই কমিটির বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের টাকা আটকে রাখার নির্দেশ কি আদৌ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট? তাঁদের বক্তব্য, আদালতের নির্দেশে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের পদ্ধতি এবং রাজ্যের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। কারা ডিএ পাবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব কমিটির উপর দেওয়া হয়নি। এদিকে, পূর্বতন সরকারের শেষ পর্যায়ে জারি হওয়া একটি নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলছে কর্মচারী সংগঠনগুলি। তাঁদের বক্তব্য, গত ১৩ মার্চ রাজ্যের অর্থ দফতর থেকে প্রকাশিত নির্দেশিকায় পঞ্চায়েত, পুরসভা, বোর্ড, কর্পোরেশন এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রান্ট-ইন-এইড কর্মীদের বকেয়া ডিএ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।
সেই নির্দেশে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথাও ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা এসওপি তৈরি করার কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পরেও সেই প্রক্রিয়া এগোয়নি বলে অভিযোগ। কর্মচারীদের একাংশের মতে, পুরো টাকা একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব না হলে সরকার কিস্তিতে পরিশোধের সময়সূচি জানাতে পারত। ২০২৭ সালের গোড়ায় প্রথম দফার টাকা এবং ২০২৮ সালে পরবর্তী কিস্তি দেওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করা যেত। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে বিষয়টি কমিটির বৈঠকের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন : আটকের পরেও মানতে হবে ২৪ ঘণ্টার নিয়ম, পুলিশের জন্য কড়া নির্দেশ শীর্ষ আদালতের
পরিস্থিতি বদল না হলে পঞ্চায়েত ও পুরসভার কর্মচারী ইউনিয়নগুলিকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হতে পারে। সিপিএম সমর্থিত সরকারি কর্মচারী সংগঠন কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী জানিয়েছেন, “এটা নতুন কোনও বিষয় নয়। আগেই মিটিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। গ্রান্ট-ইন-এইড কর্মীদের ক্ষেত্রেও অর্থ দফতর থেকে নির্দেশিকা জারি হয়েছিল। সরকার যদি আগের নির্দেশিকা না মানতে চায়, তা হলে নতুন নির্দেশিকা জারি করে তা স্পষ্ট করুক।”
অন্যদিকে, বিজেপি-মনোভাবাপন্ন রাজ্য সরকারি কর্মচারী পরিষদের সভাপতি দেবাশিস শীলের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া ডিএ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীরা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পেতে চলেছেন। দেবাশিসের কথায়, “সরকারি কর্মী, পেনশনভোগী, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা এত দিন সমান ভাবেই ডিএ পেয়ে এসেছেন। অথচ বকেয়া মেটানোর ক্ষেত্রে একাংশ পেলেন, অন্য অংশ পেলেন না— এতে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তবে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, মালহোত্রা কমিটির সুপারিশ প্রকাশিত হওয়ার পরে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং গ্রান্ট-ইন-এইডের পঞ্চায়েত কর্মীদের বকেয়া মেটানোর ব্যবস্থা করা হবে। একসঙ্গে না হলেও কিস্তিতে দেওয়া হতে পারে। আমরাও কমিটির কাছে এই কর্মীদের দাবির কথা তুলে ধরব।” সব মিলিয়ে, ডিএ নিয়ে সরকারের ঘোষণার পরেও কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন ও অসন্তোষের অবসান হচ্ছে না। একাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও অন্য অংশের দাবি, সমানভাবে সমস্ত কর্মীর বকেয়া মেটানোর রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে।












