বাংলাহান্ট ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি সরবরাহের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে ভারত (India)। সেই লক্ষ্যেই আমেরিকা (America) থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা LPG আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ভারতের মোট LPG আমদানির অন্তত ১৫ শতাংশ আমেরিকা থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়ামকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সূত্রের খবর, তিন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থার শীর্ষ আধিকারিকরা ইতিমধ্যেই আমেরিকায় গিয়ে সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।
আমেরিকা থেকে LPG আমদানি বাড়াতে কেন্দ্রের উদ্যোগ
আসলে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই ভারতের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ। এতদিন দেশের LPG চাহিদার বড় অংশ, ৯০ শতাংশেরও বেশি, পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হত। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা কয়েকটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ভারতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে LPG সংগ্রহ করে আমদানির উৎস ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে নয়াদিল্লি। এতে কোনও একটি অঞ্চলে সংকট তৈরি হলেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বেগুন নয়! স্বাদ বদল করতে মাছ দিয়ে বানিয়ে ফেলুন সুস্বাদু এই বেগুনি, রইল তার রেসিপি
আমেরিকা ইতিমধ্যেই ভারতের LPG সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৩৯ লক্ষ টন LPG আমেরিকা থেকে ভারতে এসেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। বছরের শুরুতেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি LPG আমদানি চুক্তি করেছিল ভারত। সেই চুক্তির আওতায় প্রায় ২২ লক্ষ টন LPG আমদানির কথা, যা দেশের মোট LPG আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ। এবার সেই পরিমাণ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের প্রস্তাব খতিয়ে দেখে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা যৌথভাবে আমেরিকান LPG কেনার জন্য টেন্ডারও করতে পারে বলে সূত্রের খবর।
এই পরিকল্পনার পিছনে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। আমেরিকা বরাবরই ভারতের কাছে সে দেশ থেকে আরও বেশি জ্বালানি কেনার বিষয়টি তুলে ধরেছে। ফলে আমেরিকা থেকে LPG আমদানি বাড়লে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে আলোচনাতেও কিছুটা সুবিধা হতে পারে। তবে বাণিজ্য চুক্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার প্রভাব ভারতের বাজারেও পড়েছে। সরবরাহের সমস্যার কারণে গত মাসে দেশের LPG ব্যবহার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশের বেশি কমে প্রায় ২৩.৫ লক্ষ টনে নেমেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এর প্রভাব সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও পড়েছে। অনেক পরিবার ও শিল্প সংস্থা LPG-এর বিকল্প হিসেবে PNG কিংবা অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে। ১৪ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দিল্লিতে ১৪.২ কেজির গৃহস্থালি LPG সিলিন্ডারের দাম ৯৪২ টাকা, আর ১৯ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ২৭৩৮ টাকা। রাঁচিতে একই সিলিন্ডারের দাম যথাক্রমে ৯৯৯.৫০ টাকা ও ২৯২২ টাকা। অর্থাৎ দিল্লির তুলনায় রাঁচিতে গৃহস্থালি সিলিন্ডার ৫৭.৫০ টাকা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডার ১৮৪ টাকা বেশি। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা থেকে দীর্ঘমেয়াদি LPG আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাই শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নয়। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সংকটের ধাক্কা সামলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং আমদানির উৎসে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে এটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠতে পারে।













