বাংলাহান্ট ডেস্ক: পহেলগাঁওতে জঙ্গি হামলার পর ভারত (India) সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন একটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে জল। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ফের সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৭৬তম কর্পস কমান্ডার্স কনফারেন্সে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের প্রাপ্য জল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বৈঠকের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরফেও বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, দেশের জল-অধিকার রক্ষায় সেনার শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ভারতের কঠোর অবস্থানের মুখে ইসলামাবাদের এই মন্তব্য মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল।
সিন্ধু চুক্তি নিয়ে আসিম মুনিরের হুঁশিয়ারির যোগ্য জবাব দিল ভারত (India)
সিন্ধু জলচুক্তি ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং বিশ্বব্যাংক এই ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই চুক্তির ভিত্তিতেই দুই দেশের মধ্যে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার জল বণ্টন হয়ে এসেছে। কিন্তু পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলার পর নয়াদিল্লি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময় সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে ভারত (India) ‘অপারেশন সিঁদুর’ও শুরু করে। এরপর থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক বৈঠকেও ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রাপ্য জল আটকে দেওয়া বা অন্যদিকে প্রবাহিত করার যে কোনও উদ্যোগকে তারা যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য বলেই মনে করে।
আরও পড়ুন: গ্রান্ট-ইন-এইডদের বকেয়া DA, DR কবে মিলবে? সমাজমাধ্যমে বড় বার্তা সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের
পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু নদী শুধু একটি নদী নয়, বরং দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন এবং অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি এই নদী ব্যবস্থার জলের উপর নির্ভরশীল। ফলে জলপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর। এই কারণেই ইসলামাবাদ সিন্ধু জলচুক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে। গত ৩০ জুন পাকিস্তানে আয়োজিত সিন্ধু জলচুক্তি বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও বলেন, এটি শুধুমাত্র জল বণ্টনের প্রশ্ন নয়, বরং পাকিস্তানের অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। তাঁর বক্তব্যেও ভারতকে চুক্তি কার্যকর রাখার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে, ভারত তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। কেন্দ্রের মতে, সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদে মদত চলতে থাকলে স্বাভাবিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয়। ভারত বারবার স্পষ্ট করেছে যে, সন্ত্রাস ও স্বাভাবিক সহযোগিতা একসঙ্গে চলতে পারে না। একইভাবে, “জল এবং রক্ত একসঙ্গে বইতে পারে না”—এই অবস্থানও নয়াদিল্লি একাধিকবার প্রকাশ্যে জানিয়েছে। ভারতের দাবি, পাকিস্তান যদি সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে কার্যকরভাবে লাগাম না টানে, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মতো জল-সহযোগিতার বিষয়েও আগের অবস্থায় ফেরা কঠিন হবে। ফলে সিন্ধু জলচুক্তি এখন শুধু জল বণ্টনের চুক্তি নয়, বরং দুই দেশের বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: আকাশ-পাতাল তফাৎ! লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা কতটা আলাদা জানুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে চলমান অচলাবস্থা ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান জোরালো করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভারত (India) সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিজের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ। ফলে আপাতত এই ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের উপর।













