বাংলাহান্ট ডেস্ক:হিমালয়ের বুকে থাকা হিমবাহ হ্রদগুলির উপর নজরদারি আরও জোরদার করতে বড় পদক্ষেপ করেছে ভারত (India)। ইসরোর অধীন ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার (NRSC) উপগ্রহ চিত্রের সাহায্যে সিকিম (Sikkim) দেশের হিমবাহ সংলগ্ন নদী অববাহিকাগুলির একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেছে। ২০১৬-১৭ সালের উচ্চ রেজোলিউশনের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে অন্তত ০.২৫ হেক্টর আয়তনের ২৮ হাজার ৪৩টি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৭০টি হ্রদ ভারতের ভূখণ্ডে এবং ২০ হাজার ৪৭৩টি হ্রদ সীমান্তবর্তী এলাকায় রয়েছে। দেশের ভিতরে থাকা হ্রদগুলির সংখ্যাও সব জায়গায় সমান নয়। লাদাখে ৩২১৯টি, অরুণাচল প্রদেশে ২১৮৮টি, সিকিমে ৭৩৩টি, জম্মু ও কাশ্মীরে ৫৪৬টি, হিমাচল প্রদেশে ৫৩৭টি এবং উত্তরাখণ্ডে ৩৪৭টি হ্রদ চিহ্নিত হয়েছে।
সিকিমের (Sikkim) বিপজ্জনক হিমবাহের তালিকা তৈরি করল ISRO-র:
তবে শুধু হ্রদের সংখ্যা জানা নয়, কোনগুলি ভবিষ্যতে বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে, সেটাই এখন নজরদারির অন্যতম লক্ষ্য। ইসরোর দীর্ঘমেয়াদি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণে ১৯৮৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২ হাজার ৪৩১টি হ্রদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ১৯৮৪ সালের পর থেকে ৬৭৬টি হ্রদের আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হিমবাহ গলে জল জমার ফলে আয়তন বাড়তে থাকা এই হ্রদগুলির মধ্যে ১৩০টি ভারতের ভূখণ্ডে রয়েছে। এই ধরনের হ্রদের ক্ষেত্রে হঠাৎ প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল জল নেমে এলে তৈরি হতে পারে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা GLOF। যার জেরে পাহাড়ি এলাকায় নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে গিয়ে নিচের দিকে থাকা জনবসতি, রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে (Sikkim)।

আরও পড়ুন: ট্রাফিক চালান না দিলে এবার বিদ্যুৎ বিলে জুড়বে জরিমানা? কী পরামর্শ সুপ্রিম কোর্টের?
সিকিমের দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদের বিপর্যয় সেই আশঙ্কারই ভয়াবহ উদাহরণ। ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর রাতে হ্রদের কাছে বড়সড় হিমবাহ ধসের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আইআইটি ভুবনেশ্বরের গবেষক অসীম সাত্তারের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ১৪.৭ মিলিয়ন ঘনমিটার বরফ ও হিমবাহের অংশ হ্রদে পড়ে প্রায় ২০ মিটার উঁচু ঢেউ তৈরি করেছিল। সেই ঢেউ হ্রদের সামনের প্রাকৃতিক বাঁধে আঘাত করে তা ভেঙে দেয় এবং প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনমিটার জল বেরিয়ে যায়। প্রবল জলস্রোতের সঙ্গে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ঘনমিটার পলি ও মাটি নিচের দিকে নেমে তিস্তা নদীতে মিশেছিল। গবেষণায় আরও দেখা যায়, বিপর্যয়ের আগে কয়েক বছর ধরেই লোনার্ক হ্রদের কিছু অংশের অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছিল।
এই ঘটনার পর হিমবাহ হ্রদ নিয়ে কেন্দ্রের প্রস্তুতিও আরও জোরদার হয়েছে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি ১৯৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম এবং উত্তরাখণ্ডে GLOF-এর ঝুঁকি কমাতে ১৫০ কোটি টাকার জাতীয় কর্মসূচিও অনুমোদন করা হয়েছে। দেশের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোকেও এই ঝুঁকির আওতায় এনে সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি এমন ৪৭টি বাঁধ চিহ্নিত করেছে, যেগুলি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে হড়পা বান নামলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ শুধু পাহাড়ি জনপদ নয়, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকেও আগাম প্রস্তুতির আওতায় আনা হচ্ছে।
প্রযুক্তির দিক থেকেও নেওয়া হয়েছে নতুন উদ্যোগ। চলতি বছরের জুনে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং বা C-DAC সিকিমকে (Sikkim) দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হিমবাহ হ্রদ প্রোফাইলিং প্যাকেজ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্গম ও উঁচু এলাকার হ্রদের গভীরতা মাপা এবং ত্রিমাত্রিক আয়তন নির্ধারণের জন্য স্বয়ংক্রিয় জলযান। পাশাপাশি মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ ও সিকিমের ৩০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের জন্য পরিকল্পিত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা অন্তত ৬০টি হ্রদে সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছে। ফলে উপগ্রহে নজরদারি, মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং আগাম সতর্কবার্তা—এই তিনটি স্তরকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে হিমবাহ হ্রদজনিত বিপর্যয়ের ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্র।













