বাংলাহান্ট ডেস্ক: দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের হৌজ রানি এলাকার একটি হোটেলে (Delhi Hotel Fire) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যখন চারদিকে আতঙ্ক, আর্তনাদ এবং মৃত্যুভয় ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন স্থানীয় গদি ব্যবসায়ী রিয়াজুদ্দিন মনসুরি এবং তাঁর ছেলে আরমান মনসুরি। বুধবার সকালে ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলে আগুন লাগার পর বহু আবাসিক ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, অনেকের কাছেই জানালা দিয়ে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় খোলা ছিল না। ঠিক সেই সময় নিজেদের ব্যবসার ক্ষতির কথা না ভেবে দোকান থেকে একের পর এক নতুন গদি এনে হোটেলের নিচের রাস্তায় বিছিয়ে দেন বাবা-ছেলে। তাঁদের এই তৎপরতায় অনেকজন প্রাণে বেঁচে যান বলে স্থানীয়রা জানান।
দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে (Delhi Hotel Fire) নিজেদের ক্ষতির কথা না ভেবে সাহায্যের হাত বাড়ালেন যাঁরা:
রিয়াজুদ্দিনের গদির দোকানটি প্রায় চার দশক ধরে ওই এলাকায় পরিচিত। হোটেলের (Delhi Hotel Fire) ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত দোকান থেকেই সেদিন ২০ থেকে ২৫টি নতুন গদি এবং একাধিক কম্বল বের করে আনা হয়। আরমান মনসুরি জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তখন হোটেলের নিচতলা আগুনে পুড়ছে এবং উপরের তলায় আটকে থাকা মানুষজন প্রাণভয়ে চিৎকার করছেন। তিনি কোনও কিছু না ভেবেই দ্রুত দোকান থেকে গদি এনে রাস্তায় বিছিয়ে দেন, যাতে উপর থেকে লাফ দিলে মানুষজন গুরুতর আঘাত না পান। পরে আহত ও মৃতদের সরিয়ে আনতেও দোকানের চাদর ও কম্বল ব্যবহার করা হয়।
এই ঘটনায় প্রায় দু’লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিয়াজুদ্দিন। তবে তাঁর কথায়, সেই মুহূর্তে লাভ-লোকসানের হিসাব মাথায় আসেনি। তিনি বলেন, “কে হিন্দু, কে মুসলিম তা ভাবার সময় ছিল না। শুধু জানতাম, সবাই মানুষ এবং সবাই ভারতীয়। তাঁদের বাঁচানোই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।” তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই বহু মানুষের মন জয় করেছে। সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়তেই অসংখ্য মানুষ তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, এমন মানবিক কাজের জন্য সরকারিভাবে তাঁকে সম্মানিত করা উচিত। পাশাপাশি তাঁর আর্থিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় স্থানীয় আরও বহু মানুষ উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় যুবক মহম্মদ আফজল জানান, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভিতরে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা গদি বিছিয়ে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, ম্যাক্স হাসপাতালের কর্মী ওয়াসিম রাজা তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে একাধিক আহত ব্যক্তিকে সিপিআর দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তিনি দ্রুত হাসপাতালের মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যার ফলে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। স্থানীয়দের মতে, এই সম্মিলিত উদ্যোগ না থাকলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।

আরও পড়ুন: কয়েক লক্ষ টাকার চাকরির সুযোগ ছেড়ে শুরু করেন UPSC-র প্রস্তুতি! তৃতীয় হয়ে নজির গড়লেন আকাংশ
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে (Delhi Hotel Fire) অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৭ জন। দমকল বাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উদ্ধারকাজ চালায়। তবে এই দুর্ঘটনার মধ্যেও যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হল সাধারণ মানুষের অসাধারণ মানবিকতা। নিজের ব্যবসার ক্ষতির কথা ভুলে রিয়াজুদ্দিন ও আরমান যেভাবে অচেনা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তা নিঃসন্দেহে মানবতার এক বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও তাঁদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে দিয়েছে, সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষই হয়ে উঠতে পারেন প্রকৃত নায়ক।













