বাংলাহান্ট ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মধ্যেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত (India)। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও নয়াদিল্লি আগেভাগেই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে রাশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়ে সম্ভাব্য সংকটের প্রভাব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আমেরিকা থেকে তেল কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে নতুন আমদানি কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছে ভারত।
তেল আমদানি সচল রাখতে বড় গেমপ্ল্যান ভারতের (India):
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের দৈনিক গড় অপরিশোধিত তেল আমদানি বেড়ে প্রায় ২৬.৬ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছেছে। মে মাসে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯.১ লক্ষ ব্যারেল। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারতের অবস্থান এবং আমদানি নীতির পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। ফলে ভারতের বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে রাশিয়ার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে ইউএই থেকেও ভারতের তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জুন মাসে দেশটি থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ৬.৩৬ লক্ষ ব্যারেল তেল এসেছে। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলাও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উঠে এসেছে, যেখান থেকে দৈনিক প্রায় ২.০৯ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করা হয়েছে। সৌদি আরব থেকেও নিয়মিত সরবরাহ বজায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি সঙ্কটের আবহেই কাতারের LNG প্ল্যান্টে ভয়াবহ বিস্ফোরণ! গুরুতর যখন কমপক্ষে ৫৪, নিখোঁজ ১৮
অন্যদিকে, আমেরিকা থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে। জুন মাসে ভারতের দৈনিক গড় আমদানি নেমে এসেছে প্রায় ৯১ হাজার ব্যারেলে, যেখানে মে মাসে তা ছিল প্রায় ২.৫২ লক্ষ ব্যারেল। অর্থাৎ এক মাসে আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও কমে গিয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ হল রাশিয়ার তেলের তুলনায় মার্কিন তেলের দাম বেশি হওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতার দিক থেকে রাশিয়া এখনও ভারতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিকল্প। সেই কারণেই ভারতীয় শোধনাগারগুলি তুলনামূলক সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বও এই সিদ্ধান্তের পিছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং ইউএই-এর মতো উপসাগরীয় দেশগুলির জ্বালানি রফতানির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। সাম্প্রতিক সংঘাত এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও যুদ্ধবিরতির পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। সেই কারণেই ভারত বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের উপর জোর বাড়িয়েছে এবং আমদানির ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রস্রাব, থুতু, প্লাস্টিক, কোন ভুলে কত জরিমানা? প্রকাশ্যে পুরো তালিকা
ভারতের (India) এই পদক্ষেপের গুরুত্ব আরও বেশি কারণ দেশটি এখনও জ্বালানি আমদানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৮ শতাংশ, প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এলপিজির প্রায় ৬৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দেশের অর্থনীতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই রাশিয়া, ইউএই, ভেনেজুয়েলা এবং অন্যান্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহ বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও মজবুত করার পথে হাঁটছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কৌশল ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশের জন্য বড় সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে পারে।

















