বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারত ও সিঙ্গাপুরের (India-Singapore) সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করে তুলতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল দুই দেশ। ২০ অগস্ট সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয় ভারত-সিঙ্গাপুর মন্ত্রী পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকের চতুর্থ পর্ব। বৈঠকে দুই দেশের সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হয়। উন্নত উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন—এই ছয়টি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সবুজ অর্থনীতি (Green Economy), শিল্প পার্ক, খাদ্য নিরাপত্তা, ফিনটেক, সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) এবং পরিবেশবান্ধব জাহাজ চলাচলের মতো নতুন ক্ষেত্রেও যৌথ কাজ বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ভারত সিঙ্গাপুর (India-Singapore) সম্পর্কে নয়া সমীকরণ
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভারতীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে সিঙ্গাপুরের সরাসরি যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। এই লক্ষ্যে ভারতীয় মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়মিত সিঙ্গাপুর সফরের বিষয়েও সম্মতি তৈরি হয়েছে। বৈঠকে মোট দুটি সমঝোতা স্মারক এবং একটি অভিপ্রায়পত্র বিনিময় করা হয়। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের Food Safety and Standards Authority of India বা FSSAI এবং Singapore Food Agency-র মধ্যে একটি MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত তথ্য ও অভিজ্ঞতা আদানপ্রদান সহজ হবে। পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রক এবং সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও যুব মন্ত্রকের মধ্যেও সামুদ্রিক ঐতিহ্য নিয়ে সহযোগিতার চুক্তি হয়েছে।
আরও পড়ুন: চাকরি, অভাব, অসুস্থতা—কিছুই থামাতে পারেনি! সব বাধা পেরিয়ে UPSC-তে 107 স্থান পেয়ে IAS হলেন অংশুমান
দুই দেশের ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাতেও নতুন গতি এসেছে। টেলিকম ও সম্প্রচার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে অভিজ্ঞতা এবং তথ্য ভাগ করে নিতে ভারতের টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা TRAI এবং সিঙ্গাপুরের ইনফোকম মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা IMDA-র মধ্যে একটি ‘Letter of Intent’ বিনিময় করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই UPI-PayNow সংযোগের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ছে। ভারতীয় জেনেরিক ওষুধ সিঙ্গাপুরের বাজারে নথিভুক্ত করার জন্য পাইলট প্রকল্পও চালু হয়েছে। অন্যদিকে লিচু, আম, চেরি ও আলুবোখরার মতো ভারতীয় ফলের রপ্তানিতে অগ্রগতি হয়েছে। সিঙ্গাপুরের খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা কয়েকটি ভারতীয় সংস্থাকে প্রক্রিয়াজাত পোল্ট্রি পণ্য রপ্তানির অনুমোদনও দিয়েছে। চেন্নাইয়ে জাতীয় দক্ষতা উৎকর্ষ কেন্দ্র তৈরির কাজ এগোচ্ছে এবং ২০২৬ সালের ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হবে ভারত-সিঙ্গাপুর হ্যাকাথনের চতুর্থ সংস্করণ।
প্রযুক্তি ও শিল্প ক্ষেত্রে বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে দুই দেশের আগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতে Green Lane Initiative দ্রুত চালুর পাশাপাশি সবুজ হাইড্রোজেনের সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির কাজও এগোচ্ছে। সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন বেঙ্গালুরুতে তাদের নতুন অফিস খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সিঙ্গাপুরের সিনিয়র মন্ত্রী কে শানমুগাম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী Vivian Balakrishnan-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। জয়শঙ্কর ও বালাকৃষ্ণান সিঙ্গাপুরে ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সারি-কাম-রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ভারত-সিঙ্গাপুর বিজনেস ফোরামে বক্তব্য রাখেন এবং বিনিয়োগকারী ও শিল্প প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতিন প্রসাদও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

আরও পড়ুন: আমদানির পর মজুতেও লাগাম, চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে বড় পদক্ষেপ মোদি সরকারের
সব মিলিয়ে, মন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্য বা বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, পরিবেশ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো ভবিষ্যৎমুখী ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের সিঙ্গাপুর সফরের সময় ভারত-সিঙ্গাপুর (India-Singapore) সম্পর্ককে ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ উন্নীত করা হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং-এর ভারত সফরের সময় এই অংশীদারিত্বের জন্য একটি রোডম্যাপও গ্রহণ করা হয়। এবার তারই ধারাবাহিকতায় নতুন চুক্তি ও উদ্যোগগুলি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং শিল্পক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।













