বাংলাহান্ট ডেস্ক: এবার থেকে হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) আর টোল আদায় করবে না ইরান। তবে, কর আদায়ের নতুন উপায়ও যে ইরান বের করতে পারেনি তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার আবহে অবশেষে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পারমাণবিক চুক্তি কার্যত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই চুক্তির আওতায় ইরানকে একাধিক বড় অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন। জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে রাখা একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ফের ইরানকে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, মার্কিন প্রশাসনের তরফে ইরানের বাজেয়াপ্ত করা বিপুল পরিমাণ অর্থও ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার আশ্বাস মিলেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এই চুক্তিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিনের সংঘাত ও উত্তেজনার পর এই প্রথমবার আমেরিকা ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবার হরমুজে (Strait of Hormuz) ‘টোল’ নয়! দিতে হবে নতুন ফি!
সূত্রের খবর, এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হল ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে আর এগোবে না এবং তাদের পরমাণু কর্মসূচির উপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বজায় থাকবে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়ের মতো বিতর্কিত নীতিও প্রত্যাহার করতে হবে তেহরানকে। এর বদলে আমেরিকা ইরানের উপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশেষ করে তেল রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ইরানের অর্থনীতি বড় স্বস্তি পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ গত কয়েক বছরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেশের মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক সংকটও ভয়াবহ আকার নিয়েছিল। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে ফের তেল বিক্রির সুযোগ ইরানের অর্থনীতিতে নতুন অক্সিজেন জোগাতে পারে।
আরও পড়ুন: ইদের অনুষ্ঠান থেকে সনাতন ধর্মকে ‘গন্দা ধর্ম’, ‘নোংরা ধর্ম’ বলার অভিযোগ! মমতার বিরুদ্ধে দায়ের FIR
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই সোমবার জানিয়েছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) সরাসরি টোল আদায় করবে না। তবে নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার নামে জাহাজগুলির কাছ থেকে পরিষেবা বাবদ অর্থ নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে ‘টোল ট্যাক্স’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে ইরানকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে। বাঘাই জানান, খুব শীঘ্রই ওমানের সহযোগিতায় হরমুজ প্রণালী পরিচালনা নিয়ে একটি নতুন প্রোটোকল প্রকাশ করা হবে। সেই নীতিতে পরিবেশ রক্ষা, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে এই পরিষেবা বাবদ কত টাকা নেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহণ করা হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার ও ইরাকের মতো তেল উৎপাদক দেশগুলির জন্য এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে ইরান-আমেরিকা সংঘাতের জেরে এই প্রণালী ঘিরে বারবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কখনও জাহাজ আটক, কখনও টোল আরোপ, আবার কখনও সামরিক সংঘর্ষের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছিল। ফলে এই নতুন চুক্তি কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক তেল বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কাও অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গিয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবেই আমেরিকা ইরানের বাজেয়াপ্ত করা কয়েকশো কোটি ডলারের সম্পদ ফেরত দিতে সম্মত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কে ইরানের বিপুল অর্থ আটকে ছিল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারছিল না তেহরান। এবার সেই অর্থের একটি বড় অংশ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ইরানের প্রবেশাধিকারও আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনার আলোচনা চলছে। এতে শুধু তেল রপ্তানিই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ইরান নতুন করে সক্রিয় হতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও আমেরিকার তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলছে, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরই এই সমঝোতা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: ব্রিটেনে ইতিহাস গড়ল ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবার! এক সপ্তাহের ব্যবধানে মা-ছেলে দু’জনেই হলেন মেয়র
তবে এই চুক্তি ঘিরে বিতর্কও কম নয়। আমেরিকার একাংশ মনে করছে, ইরানকে এত বড় অর্থনৈতিক ছাড় দিলে ভবিষ্যতে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে ইরানের কট্টরপন্থী মহলের অভিযোগ, আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার দেশের নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসছে। তবুও আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ মনে করছে, সংঘাত ও যুদ্ধের পথ ছেড়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি ছিল। এখন নজর রয়েছে, কবে এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় এবং বাস্তবে তার কতটা কার্যকর প্রয়োগ সম্ভব হয় তার দিকে (Strait of Harmuz)।













