লাহোরে ‘হিন্দু নাম’ ফেরানো নিয়ে বিতর্ক, চাপের মুখে নামবদল থামাল পাক পাঞ্জাব সরকার

Published on:

Published on:

Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে (Lahore) ঐতিহাসিক নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মারিয়াম নওয়াজ সম্প্রতি শহরের একাধিক রাস্তা, মোড় এবং এলাকার পুরনো নাম পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশভাগের আগে লাহোরের বহু অঞ্চলের নামের সঙ্গে হিন্দু ও শিখ ঐতিহ্যের গভীর যোগ ছিল। সেই ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত মার্চ মাসে প্রশাসনিক বৈঠকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মৌলবাদী সংগঠন, কট্টরপন্থী বক্তা এবং সমাজমাধ্যমের একাংশের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হলো পাঞ্জাব প্রশাসন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আপাতত নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।

লাহোরে (Lahore) নাম পরিবর্তন স্থগিত রাখল পাক পাঞ্জাব সরকার

লাহোর একসময় অবিভক্ত ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। দেশভাগের আগে শহরটির জনসংখ্যার বড় অংশ ছিল হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের। ফলে বহু রাস্তা, মহল্লা ও বাজারের নামেও সেই ঐতিহ্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান গঠনের সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে বদলে ফেলা হয় সেই সব নাম। ইসলামি পরিচয়কে সামনে রেখে নতুন নামকরণ শুরু হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে লাহোরের অতীত ইতিহাসকে তুলে ধরতে উদ্যোগী হয় পাঞ্জাব সরকার। প্রশাসনের একাংশের মতে, শহরের বহু পুরনো নাম শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, ঐতিহাসিক পরিচয়েরও অংশ। সেই কারণেই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নাম ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন: মাত্র ৫১ টাকায় আনলিমিটেড কলিং ও দিনে ২GB ডেটা, ধামাকা ‘ফ্রিডম অফার’ আনল BSNL

গত ২০ মে আনুষ্ঠানিক ভাবে লাহোর এবং পাঞ্জাবের একাধিক এলাকার নাম পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়। ইসলামপুরের নাম ফের ‘কৃষ্ণনগর’, সুন্নতনগরের নাম ‘সন্তনগর’ এবং মৌলানা জাফর চকের নাম ‘লক্ষ্মী চক’ করা হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় ‘বাবরি মসজিদ চক’-এর নাম বদলে ‘জৈন মন্দির চক’ করার সিদ্ধান্তে। এছাড়াও মুস্তফাবাদের নাম ‘ধর্মপুরা’, আল্লামা ইকবাল রোডের নাম ‘জেল রোড’, ফতিমা জিন্না রোডের নাম ‘কুইন রোড’ এবং বাঘ-ই-জিন্না রোডের নাম ‘লরেন্স রোড’ করা হয়েছিল। এই নামগুলির অধিকাংশই ব্রিটিশ আমল অথবা দেশভাগ-পূর্ব লাহোরের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছিল প্রশাসন।

তবে এই ঘোষণার পর থেকেই পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধিতার ঝড় ওঠে। একাধিক মৌলবাদী সংগঠন অভিযোগ তোলে, সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে পাকিস্তানের ইসলামি পরিচয়কে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। সমাজমাধ্যমেও শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। বহু ব্লগার এবং ধর্মীয় বক্তা দাবি করেন, হিন্দু ও শিখ নাম ফিরিয়ে এনে পাকিস্তানের ‘আদর্শিক ভিত্তি’ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘জৈন মন্দির চক’ নামটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধীদের বক্তব্য, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পাকিস্তানের অতীতকে ‘পুনর্লিখনের’ চেষ্টা চলছে। এর জেরে প্রশাসনের উপর চাপ দ্রুত বাড়তে থাকে।

Pak Punjab Government Puts Name Change in Lahore on Hold

আরও পড়ুন: ভোটার কার্ডই শেষ কথা নয়! ‘SIR’ ক্ষমতা বহাল রেখে ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

যদিও পাঞ্জাব সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও কোনও বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি, তবে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে আপাতত নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা পাকিস্তানের ভিতরে ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে চলা দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকেই সামনে এনে দিল। একাংশ মনে করছে, লাহোরের বহুত্ববাদী অতীতকে তুলে ধরার প্রয়াস রাজনৈতিক সাহসিকতার পরিচয় ছিল। অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে ‘ঐতিহ্যের আড়ালে মতাদর্শগত পরিবর্তনের চেষ্টা’ বলেই ব্যাখ্যা করছে। ফলে লাহোরের নামবদল বিতর্ক এখন শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গণ্ডি পেরিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে (Lahore)।