বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতের (India) মহাকাশ গবেষণায় এবার আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘদিন ধরে যে রকেটগুলির উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের দায়িত্ব মূলত ইসরোর (ISRO) হাতেই ছিল, ধীরে ধীরে সেই কাজের একটি বড় অংশ বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা এগোচ্ছে। সেই তালিকায় এবার রয়েছে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রকেট এলভিএম৩, যাকে ‘বাহুবলী’ (Bahubali) নামেও চেনেন অনেকে। এই রকেটের প্রযুক্তি বেসরকারি শিল্পের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ইন-স্পেসের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, আদানি গ্রুপ, মাহিন্দ্রা, জেএসডব্লিউ-সহ একাধিক দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী এই সুযোগে আগ্রহ দেখিয়েছে। এলভিএম৩-এর মতো পরীক্ষিত ভারী উৎক্ষেপণযান বাণিজ্যিকভাবে তৈরি ও পরিচালনার সুযোগ ভারতের মহাকাশ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসরোর (ISRO) LVM3 রকেট তৈরির দৌড়ে আদানি, L&T-সহ একাধিক সংস্থা:
এলভিএম৩ বর্তমানে ইসরোর (ISRO) সবচেয়ে ভারী কার্যকর উৎক্ষেপণযান। প্রায় চার টন ওজনের উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানোর সক্ষমতা রয়েছে এই রকেটের। ভবিষ্যতে বড় যোগাযোগ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পাশাপাশি গগনযান কর্মসূচিতেও এর মানব-উপযোগী সংস্করণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে এলভিএম৩-এর প্রযুক্তি হস্তান্তর নিছক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারতের মহাকাশ পরিকাঠামোকে আরও বড় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর আগে স্মল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল বা এসএসএলভি প্রযুক্তি হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্সের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পের নেতৃত্বে পিএসএলভি উৎপাদনের কাজও এগোচ্ছে। অর্থাৎ, ধীরে ধীরে ইসরোর ভূমিকা রকেটের নিয়মিত উৎপাদনের পাশাপাশি গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি এবং গভীর মহাকাশ অভিযানের দিকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন: নজরদারি এড়াতে জঙ্গিদের নয়া ছক! সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে পর্ন সাইটে চলছে গোপন যোগাযোগ
এই প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী রয়েছে। জানা গিয়েছে, জেএসডব্লিউ এবং ইথেরিয়াল এক্সপ্লোরেশন গিল্ডের একটি জোট এবং সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ, ভারত ফোর্জ ও ইনক্স ইন্ডিয়ার নেতৃত্বাধীন আর একটি গোষ্ঠী আগ্রহ দেখিয়েছে। এলঅ্যান্ডটি, মাহিন্দ্রা এবং আদানি গ্রুপও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। তবে প্রত্যেকেরই মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। কেউ প্রোপেল্যান্ট ও রকেট মোটর তৈরি করে, কেউ অ্যারোস্পেস কম্পোনেন্ট বা প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষ, আবার কেউ প্রতিরক্ষা ও বিমান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বড় পরিসরে কাজ করছে। ফলে এলভিএম৩ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দেশীয় শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই সংস্থাগুলির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিও যথেষ্ট বিস্তৃত। নির্বাচিত সংস্থা বা কনসোর্টিয়ামকে রকেটের নকশা, প্রোপালশন, অ্যাভিওনিক্স, নেভিগেশন, উৎপাদন, পরীক্ষা, যান সংযোজন এবং উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত জ্ঞান আয়ত্ত করতে হবে। প্রাথমিকভাবে ইসরো ও ইন-স্পেসের সঙ্গে কাজ করে প্রযুক্তি বোঝার পর নিজস্ব পরিকাঠামো গড়ে তুলবে নির্বাচিত সংস্থা। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে প্রায় ৪২ মাস সময় দেওয়া হবে এবং এই সময়ের মধ্যে দুটি এলভিএম৩ তৈরি করার লক্ষ্য থাকবে। প্রথমে আগ্রহপত্রের ভিত্তিতে সংস্থাগুলির সক্ষমতা যাচাই হবে, এরপর কারিগরি ও বাণিজ্যিক প্রস্তাব বিবেচনা করে চূড়ান্ত সংস্থা বেছে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, এখনই কোনও বেসরকারি সংস্থার হাতে এলভিএম৩-এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব চলে যাচ্ছে না; এটি একটি ধাপে ধাপে এগোনো প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবার ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে! উচ্ছ্বসিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট
এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উৎক্ষেপণ পরিষেবার বাজার এবং ভারতের মহাকাশ অর্থনীতিকে আরও বড় করার লক্ষ্য। ইন-স্পেসের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মহাকাশ অর্থনীতি ২০২২ সালের প্রায় ৮.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। উৎক্ষেপণযান ও উপগ্রহ তৈরির মতো ক্ষেত্রেও দ্রুত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ব বাজারেও উৎক্ষেপণ পরিষেবার চাহিদা বাড়ছে। তাই পরীক্ষিত এলভিএম৩-কে বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে ভারতীয় সংস্থাগুলি দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাবে। ইন-স্পেস চেয়ারম্যান পবন গোয়েঙ্কার বক্তব্যেও স্পষ্ট, ভবিষ্যতে বেসরকারি শিল্পকে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও উৎক্ষেপণে আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, ‘বাহুবলী’ এলভিএম৩-এর প্রযুক্তি বেসরকারি হাতে যাওয়া ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে (ISRO)।













