বাংলা হান্ট ডেস্ক: রাজস্থানের (Rajasthan) ঝুনঝুনু জেলার পিলানির বাসিন্দা মুকেশ মঞ্জুর জীবনযাত্রা যেন এক অন্যরকম সাফল্যের গল্প (Success Story)। একসময় দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। কাজ করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিগন্যাল শাখায়, পরে যোগ দিয়েছিলেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড বা এনএসজি-তে কমান্ডো হিসেবে। কিন্তু কর্মজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে তিনি বেছে নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। বন্দুকের বদলে হাতে তুলে নেন কৃষিকাজের দায়িত্ব। আজ তাঁর ৭৫ একরের ‘মঞ্জু ফার্মস’ জৈব চাষ এবং কৃষি-পর্যটনের পরিচিত উদাহরণ। বিভিন্ন ধরনের ফল, ঔষধি গাছ এবং গবাদি পশুপালনকে কেন্দ্র করে এই খামার থেকে বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার ব্যবসা হয় বলে জানা গিয়েছে।
মুকেশ মঞ্জুর অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
মুকেশের শিকড় অবশ্য কৃষির সঙ্গেই জড়িয়ে। তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত। ২০০১ সালে বিড়লা স্কুল থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করার পর তিনি রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ পড়তে শুরু করেন। তবে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়, ২০০২ সালের ডিসেম্বরে, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। সিগন্যাল শাখায় কাজ করার পর ২০০৮ সালে এনএসজি-তে কমান্ডো হিসেবে দায়িত্ব পান। কর্মসূত্রে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়া এবং বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে। বিদেশে খেজুর ও জলপাইয়ের মতো ফসলের চাষ দেখে নিজের জমিতেও নতুন কিছু করার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। সেই ভাবনা থেকেই চাকরিতে থাকাকালীন ধীরে ধীরে খামার গড়ার পরিকল্পনা শুরু করেন মুকেশ (Success Story)।
আরও পড়ুন: ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভে ‘উদ্বিগ্ন’ রাষ্ট্রসংঘ! বিবৃতি জারি করে কী জানাল ভারত?
২০১২ সাল থেকেই নিজের সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে বিভিন্ন গাছ লাগাতে শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথমে ৪০০টি কিনো ও লেবুগাছ, পরের বছর ৪৫০টি জলপাইগাছ এবং ২০১৪ সালে ১৫০টি খেজুরগাছ রোপণ করেন। এর মধ্যেই ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তাঁর বাবার ক্যানসার ধরা পড়ে। পরিবারের পাশে থাকার জন্য স্বেচ্ছাবসরের আবেদন করেন মুকেশ। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে বাবার মৃত্যুর আগেই সেই আবেদন মঞ্জুর হয়। নতুন কিছু শুরু করার বিষয়ে বাবার উৎসাহ তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল। বাবার সেই কথাগুলি মনে রেখেই শেষ পর্যন্ত পিলানিতে ফিরে কৃষিকাজকেই নিজের প্রধান পেশা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ফিরে এসে ২৫ একরের জমিকে বাড়িয়ে প্রায় ৭৫ একরে নিয়ে যান মুকেশ। রাসায়নিকের উপর নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে চাষ করার দিকে জোর দেন তিনি। মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে খামারে প্রায় ২৫টি গির ও সাহিওয়াল জাতের গরু পালন করা হয়। গরুর গোবর ও মূত্র দিয়ে জীবামৃত, ঘন জীবামৃত এবং ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করা হয়। বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য তৈরি করেছেন প্রায় তিন লক্ষ লিটার জলধারণ ক্ষমতার একটি পুকুরও। বর্তমানে খামারে খেজুর, জলপাই, কিনো, মিষ্টি লেবু, কমলা, আলুবোখারা, চন্দন, পেয়ারা ও ডালিম-সহ ৫০টিরও বেশি প্রজাতির প্রায় পাঁচ হাজার গাছ রয়েছে।

আরও পড়ুন: পিছু ছাড়ছে না বিপর্যয়! ফের হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপাল, ভেসে গেল বাড়িঘর-সেতু
শুধু ফসল উৎপাদনেই থেমে থাকেননি মুকেশ। প্রচলিত বাজারের উপর নির্ভর না করে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ২২৫ জন সদস্যের একটি ক্রেতা-নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার মাধ্যমে ঘি, ফল এবং অন্যান্য কৃষিজ পণ্য বিক্রি করা হয়। ২০২১ সালে মঞ্জু ফার্মসে শুরু হয় কৃষি-পর্যটনও। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কটেজে থাকার পাশাপাশি পর্যটকেরা গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্বাদ পান, ঘোড়া ও উটে চড়েন এবং নিজের হাতে ফল তোলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কৃষি, পশুপালন, সরাসরি বিপণন ও পর্যটনকে এক ছাতার তলায় এনে মুকেশ দেখিয়েছেন, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে চাষবাসও লাভজনক উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর এই যাত্রা প্রাক্তন সেনাকর্মীদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কৃষি-উদ্যোক্তাদের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে (Success Story)।













