বাংলাহান্ট ডেস্ক: বড় কোনও ব্যবসায়িক পরিবার থেকে উঠে আসেননি তিনি। ছিল না ব্যবসার পূর্ব অভিজ্ঞতাও। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বহুজাতিক সংস্থা অ্যাকসেঞ্চারে মোটা বেতনের চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপদ চাকরির জীবন ছেড়ে নিজের সফলভাবে (Success Story) স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন মহীশূরের (Mysore) বাসিন্দা সুপ্রীত কাশ্যপ (Supreet Kashyap)। মাত্র ১০ লক্ষ টাকা সঞ্চয় এবং বাবা-মায়ের আর্থিক সহায়তাকে পুঁজি করে শুরু করেছিলেন পোশাকের ব্যবসা। আজ তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ‘ওয়েলবি’-র বার্ষিক টার্নওভার ৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, জেরোধা, মেটা, অ্যামাজন, অ্যাডোবি এবং সিসকোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও এখন তাঁর সংস্থার ক্রেতা। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে কী ভাবে এই সাফল্য পেলেন সুপ্রীত, সেই কাহিনিই এখন অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে নতুন প্রজন্মের উদ্যোগপতিদের।
সুপ্রীত কাশ্যপের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
২০১৭ সালে কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হন সুপ্রীত। এরপর অ্যাকসেঞ্চারে বছরে ৬ লক্ষ টাকার বেতনে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ার চাকরিতে বেশিদিন মন টেকেনি তাঁর। এক বছরের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। নিজের ব্যবসা শুরু করার আগে দিল্লিতে সামাজিক উদ্যোগপতি হওয়ার বিষয়ে একটি কোর্সও করেন। পরবর্তী সময়ে নিজের সঞ্চয়ের ১০ লক্ষ টাকা এবং বাবা-মায়ের সহযোগিতা নিয়ে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইকো এমব্রেস ডিজাইনার ক্লোথিং প্রাইভেট লিমিটেড’। এই সংস্থার অধীনেই আত্মপ্রকাশ করে ‘ওয়েলবি’ ব্র্যান্ড। পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরি করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। বাঁশের আঁশ এবং কটন-লাইক্রার মিশ্রণে টি-শার্ট ও ইনারওয়্যার তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি। প্রথমে হাতে তৈরি পোশাক বিক্রির চেষ্টা করলেও তেমন সাফল্য আসেনি। পরে বাঁশের আঁশ দিয়ে তৈরি পোশাকের উপর জোর দেন সুপ্রীত। ৯৯৯ টাকা দামের একটি গোল গলা টি-শার্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্র্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয় (Success Story)।
আরও পড়ুন: দীপাবলিতে বিনামূল্যে সিলিন্ডার দেবে রাজ্য! ১.৮৯ কোটি পরিবারের জন্য ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
তবে ব্যবসা শুরু করলেই যে সাফল্য আসবে, এমনটা হয়নি। প্রথম বছর সংস্থার আয় হয়েছিল মাত্র ১১.৫ লক্ষ টাকা। ২০২৪ সালের প্রথম ছ’মাসে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা করে লোকসান হচ্ছিল। দক্ষ কর্মী খুঁজে পাওয়া, উৎপাদনের মান বজায় রাখা এবং গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু পণ্যের গুণমানের সঙ্গে আপস করেননি সুপ্রীত। তাঁর তৈরি পোশাকের আরাম, ঘাম শোষণ করার ক্ষমতা এবং উন্নত মান ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে। পুরনো ক্রেতাদের বারবার ফিরে আসাই ব্যবসার ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে সংস্থার বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৫ লক্ষ টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২.৫ কোটি টাকা। আর গত অর্থ বছরে ওয়েলবির বার্ষিক টার্নওভার ৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ জন কর্মী এই সংস্থায় কাজ করেন।
ওয়েলবির পোশাক তৈরি হয় তামিলনাড়ুর তিরুপুরে। অন্য দিকে, বেঙ্গালুরুর নেলামঙ্গলায় প্রায় ৫,৫০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে রয়েছে সংস্থার প্রধান গুদাম। দ্রুত ফ্যাশনের প্রতিযোগিতায় না নেমে আরামদায়ক এবং দীর্ঘস্থায়ী পোশাক তৈরির উপরই বেশি গুরুত্ব দেয় ব্র্যান্ডটি। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে গ্রাহকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সংস্থাটিকে আরও পরিচিতি এনে দেয়। এর পর কয়েক জন উচ্চপদস্থ কর্তা এবং গ্রাহক নিজেরাই সংস্থায় প্রায় ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে ওয়েলবির মোট বিক্রির প্রায় ৯৭ শতাংশ আসে নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং অ্যামাজনের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে। বাকি ৩ শতাংশ বিক্রি হয় মহীশূর ও মুম্বইয়ের দুটি অফলাইন স্টোরের মাধ্যমে। অর্থাৎ, অনলাইন নির্ভর ব্যবসার মডেলই সংস্থার দ্রুত বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

আরও পড়ুন: টাকা দিয়ে কাটতে হবে না কুপন, তারাপীঠে বিনা পয়সায় দেওয়া হয় সুস্বাদু ভোগ প্রসাদ, কোথায় জানেন?
শুধু সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পোশাক বিক্রি নয়, কর্পোরেট ক্ষেত্রেও নিজেদের জায়গা শক্ত করেছে ওয়েলবি। জেরোধা, মেটা, জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট, সিসকো, অ্যামাজন এবং অ্যাডোবির মতো সংস্থা তাদের কর্মীদের জন্য ওয়েলবির বাঁশের আঁশের মিশ্রণে তৈরি টি-শার্ট কিনছে। বিশেষ করে জেরোধার মতো সংস্থার একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ছেড়ে ওয়েলবিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের কর্পোরেট ব্যবসাকে প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ হাজারেরও বেশি পোশাক বিক্রি করে এই সংস্থা। এক সময় যে ব্যবসার প্রথম বছরে আয় ছিল মাত্র ১১.৫ লক্ষ টাকা, আজ সেটিই কয়েক কোটি টাকার সংস্থায় পরিণত হয়েছে। সুপ্রীতের এই যাত্রা দেখিয়ে দিয়েছে, বড় পুঁজি কিংবা ব্যবসায়িক পারিবারিক পরিচিতি না থাকলেও সঠিক পণ্য, গ্রাহকদের বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকলে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনো সম্ভব (Success Story)।












