বাংলাহান্ট ডেস্ক: জয়পুরের (Jaipur) বিভোর জৈন (Vibhor Jain) এবং তাঁর স্ত্রী ইশিতার (Ishita Jain) সাফল্যের কাহিনি (Success Story) একটু অন্যরকম। প্রযুক্তি ও কর্পোরেট দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন মাটির কাছাকাছি একটি জীবন। জয়পুর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে গড়ে তুলেছেন ‘কিনায়া অর্গানিক ফার্মস’। ২০১৮ সালে মাত্র ২০ টি গির গরু নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন ১০০ টি গির গরুর খামারে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫০-৩০০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। সেই দুধের একটা বড় অংশ দিয়ে ঐতিহ্যবাহী বিলোনা পদ্ধতিতে ঘি তৈরি করা হয়। তাঁদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়, দেশীয় গরু, টেকসই কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব পশুপালনের একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা।
বিভোর ও ইশিতার অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
বিভোর বেঙ্গালুরু থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে বি-টেক করেন। অন্যদিকে ইশিতা নাগপুর থেকে বি-টেক এবং পুনে থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে দু’জনেই কর্পোরেট ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু বিভোর বরাবরই বাঁধাধরা ৯টা-৫টার চাকরিতে নিজেকে দেখতে চাইতেন না। পরিবারের বাড়িতে দুটি গরু আসার পর দেশীয় গির জাতের গরু নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। ২০১৭ সালে গুজরাটের কাথিয়াওয়ারে গিয়ে স্থানীয় গো-পালকদের কাছ থেকে পশুপালনের পদ্ধতি শেখেন তিনি। তখনই তাঁর নজরে আসে একটি সমস্যা—অনেক গো-পালকের কাছে ভালো মানের দেশীয় গরু থাকলেও তাঁদের পণ্য শহরের বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ ছিল না। ফলে দুধ ও ঘি অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে হত। এই সমস্যাকেই ব্যবসার সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন বিভোর (Success Story)।
আরও পড়ুন: স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে অনীহা? ভাইরাল সোনিয়া-রাহুলের ভিডিও
পরের বছরই জয়পুরের কাছে জমি লিজ নিয়ে ২০টি গির গরু দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। প্রথম কয়েক বছর ছিল শেখার সময়। পশুপালনের পাশাপাশি মাটির গুণমান, খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিকাজ কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান বিভোর। প্রায় তিন বছর পর নিজের জমি কেনেন তিনি। ২০২২ সালে ইশিতাও কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে পুরো সময়ের জন্য স্বামীর সঙ্গে খামারের কাজে যোগ দেন। এরপর দু’জনে মিলে গড়ে তোলেন একটি বহুস্তরীয় কৃষি-বনায়ন ও চক্রাকার কৃষি ব্যবস্থা। খামারে ২,০০০-এর বেশি গাছ রয়েছে। তার মধ্যে ৪০টিরও বেশি জাতের ৫০০-র বেশি আমগাছ এবং ৩০০-র বেশি সাদা চন্দন গাছ রয়েছে। গাছের ফাঁকে গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে সুপার নেপিয়ার, জোয়ার, বাজরা, সজনে ও অ্যাসপারাগাস মতো ফসলও চাষ করা হয়।
এই পুরো ব্যবস্থায় খামারের বর্জ্যও কাজে লাগানো হয়। গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করা হয় এবং একই সঙ্গে তা জমিতে জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে ১০০টি গির গরু থেকে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। তার প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ তরল দুধ হিসেবে বিক্রি হয়। বাকি দুধ থেকে বিলোনা পদ্ধতিতে প্রতিদিন প্রায় ৯ লিটার ঘি তৈরি করা হয়। পাশাপাশি সর্ষে, চিনাবাদাম, নারকেল ও তিলের তেল, ফ্রিজ-ড্রাই প্রযুক্তিতে তৈরি কলোস্ট্রাম পাউডার এবং বিভিন্ন জৈব সবজিও উৎপাদন করে খামারটি। কিনায়ার তথ্য অনুযায়ী, এ২ দুধ প্রতি লিটার ১৫০ টাকা এবং বিলোনা ঘি প্রতি লিটার ৩,৪৯০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। জয়পুরে দুধ ও সবজি সরবরাহ করা হলেও ঘি এবং অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন: দেশে নির্মূল লাল-সন্ত্রাস! এবার ‘দিমাগি নকশাল’-দের চিহ্নিত করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী মোদীর
ব্যবসার দিক থেকেও এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গা তৈরি করেছে। গবাদি পশু বিক্রির আয় বাদ দিলে বর্তমানে খামারটির মাসিক আয় প্রায় ১৮-২০ লক্ষ টাকা বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ এই হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ২.১৬-২.৪ কোটি টাকার টার্নওভার হতে পারে। বিভোর ও ইশিতার কাছে অবশ্য এই উদ্যোগ শুধুমাত্র আয়ের উৎস নয়। তাঁদের লক্ষ্য দেশীয় গরু ও টেকসই কৃষি সম্পর্কে মানুষকে আরও সচেতন করা। তাঁদের বিশ্বাস, আধুনিক গবেষণা, পরিকল্পিত পশুপালন এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতিকে একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে গ্রাম ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যবসাও লাভজনক এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়ে উঠতে পারে (Success Story)।













