বাংলা হান্ট ডেস্ক: একসময় মরিশাসের একটি বিমা সংস্থার শীর্ষ পদে কাজ করতেন তিনি। আর্থিক ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ বছরের সফল (Success Story) অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে কাজ করতে গিয়েই এমন একটি ব্যবসার ভাবনা মাথায় আসে, যা আজ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তিনি বিনয় বালাকৃষ্ণন (Vinay Balakrishnan)। কৃষি বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব প্লেট, বাটি ও স্ট্র তৈরির ব্যবসা শুরু করেছেন তিনি। তাঁর সংস্থা ভিআইআর ন্যাচারালসের তৈরি ‘থুশান’ (Thooshan) ব্র্যান্ডের পণ্য এখন ভারত ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বের প্রায় ১০টি দেশে। একসময় যে ভাবনা ছিল নিছক কৌতূহল, আজ সেটাই হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যবসার মূল ভিত্তি।
বিনয় বালাকৃষ্ণনের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
মরিশাসের আইল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সিইও হিসেবে কাজ করার সময়ই এই উদ্যোগের বীজ বপন হয়েছিল। সেখানে খাবার পরিবেশনের জন্য জৈব-পচনশীল প্লেটের ব্যবহার দেখে অবাক হয়েছিলেন বিনয়। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, কীভাবে তৈরি হয় এই প্লেট? ভারতেও কি এমন পণ্য তৈরি করা সম্ভব? সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় গবেষণা। তিনি জানতে পারেন, পোল্যান্ডের একটি সংস্থা গমের ভুসি ব্যবহার করে প্লেট তৈরি করছে। বিষয়টি তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। এত দিন যে কৃষিজ বর্জ্যকে ফেলে দেওয়ার জিনিস বলে মনে করা হত, তা দিয়েই তৈরি হতে পারে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগার মতো পরিবেশবান্ধব সামগ্রী। সেই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি (Success Story)।
আরও পড়ুন: সমুদ্রের বুকে নতুন নজির! প্রথম প্রচেষ্টাতেই INS Vikrant-এর ডেকে সফল অবতরণ রাফালের
কেরল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘদিন আর্থিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন দায়িত্ব সামলেছেন বিনয়। ২০১৩ সালে ভারতে ফিরে আসার পর নতুন কিছু করার ইচ্ছা তৈরি হয় তাঁর। অবশেষে ২০১৮ সালে জৈব-পচনশীল পণ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। লক্ষ্য ছিল, প্লাস্টিকের মতো পরিবেশের ক্ষতি করে এমন উপকরণের বিকল্প তৈরি করা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে প্রায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২০২১ সালের অগস্টে যাত্রা শুরু করে ভিআইআর ন্যাচারালস। সংস্থাটি প্লেট, বাটি ও স্ট্র তৈরিতে চার থেকে পাঁচ ধরনের কৃষি বর্জ্য ব্যবহার করে। এই কাজে তিরুবনন্তপুরমের কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ বা সিএসআইআর-এর সহায়তাও পেয়েছে সংস্থাটি।
সংস্থার পণ্যের ব্র্যান্ডের নাম ‘থুশান’, মালয়ালম ভাষায় যার অর্থ কলাপাতা। প্রথম দিকে গমের ভুসি দিয়ে প্লেট তৈরি করা হলেও পরে উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমানে গমের ভুসির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পালক্কাড মাত্তায়ারি। সংস্থার দাবি, তাদের তৈরি জৈব-পচনশীল পণ্যগুলি প্রায় এক মাসের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে পচে যেতে পারে। ফলে কৃষিজ বর্জ্য ফেলে না দিয়ে তা থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে কোয়েম্বাটুর থেকে সংস্থার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পণ্যের দামও রাখা হয়েছে তুলনামূলকভাবে নাগালের মধ্যে। থুশান ব্র্যান্ডের এক একটি প্লেটের দাম ৯ থেকে ১৫ টাকা। অন্যদিকে, ধানের তুষ দিয়ে তৈরি স্ট্র পাওয়া যায় প্রায় আড়াই টাকায়।

আরও পড়ুন: ভারতীয় পর্যটকদের জন্য বড় খবর! দুবাই থেকে সিঙ্গাপুর; সর্বত্র UPI দিয়েই হবে পেমেন্ট
ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক বৃদ্ধির স্বপ্নও দেখছে ভিআইআর ন্যাচারালস। গত অর্থবর্ষে সংস্থার টার্নওভার ছিল ৩৫ লক্ষ টাকা। চলতি অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ১ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন বিনয়। বর্তমানে সংস্থাটি মূলত বিজনেস-টু-বিজনেস বা বি২বি মডেলে কাজ করে। অর্থাৎ, সরাসরি সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রির পরিবর্তে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয় এই সামগ্রী। আমেরিকা, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া-সহ প্রায় ১০টি দেশে পৌঁছে গিয়েছে তাদের পণ্য। প্লাস্টিকের দূষণ যখন বিশ্বজুড়ে বড় উদ্বেগের কারণ, তখন কৃষি বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। বিনয়ের এই যাত্রা প্রমাণ করে, অভিজ্ঞতা, নতুন চিন্তা এবং উদ্যোগী মনোভাব একসঙ্গে থাকলে পরিচিত পেশার বাইরেও তৈরি করা যায় সাফল্যের নতুন ঠিকানা (Success Story)।












