বাংলাহান্ট ডেস্ক: হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিম এশিয়া। একাধিক বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগের পর ইরানের (Iran) বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে আমেরিকা। ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়েছে, পরপর একাধিক জাহাজে হামলার জন্য তেহরানকে এর মূল্য চুকাতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই জলপথে যেকোনও ধরনের হামলা বা অস্থিরতা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। হামলার পর দক্ষিণ ইরানের একাধিক এলাকায় মার্কিন সেনার সীমিত সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন অর্থ দপ্তর জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যে কোনও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইরানের (Iran) তেল রপ্তানির লাইসেন্স বাতিল করল আমেরিকা
ঘটনার পরই আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ ইরানের (Iran) বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য বিক্রির জন্য ইরানকে যে সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, সাম্প্রতিক হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা আস্থার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। উল্লেখ্য, কয়েক মাস আগে দীর্ঘ সংঘাতের পর আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইরানের ওপর তেল রপ্তানি সংক্রান্ত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল, যাতে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত পরিসরে তেল বিক্রি করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর সেই সুবিধা বাতিল হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।
আরও পড়ুন: ‘ধর্ষকদের সকালে জমা, বিকেলে খরচ’! বারুইপুর এনকাউন্টারের পর চর্চায় শুভেন্দুর সেই হুঙ্কার
এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে গত কয়েক মাসের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা। সেই সময় ইজরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চালানো অভিযানের পর তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। যদিও আমেরিকা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ কোনও অবস্থাতেই অবরুদ্ধ হতে দেওয়া হবে না। পরে দীর্ঘ চার মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয় দুই দেশ। গত মাসে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনাও শুরু হয়। সেই চুক্তির অংশ হিসেবেই ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানকে সীমিত পরিসরে অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় সেই ইতিবাচক পরিবেশ আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর মূল কারণ, হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপসাগরে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ। কাতারের একটি পণ্যবাহী জাহাজসহ অন্তত চারটি ট্যাঙ্কারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও ইরান এখনও এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। তবে হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে কাতার, যা সম্প্রতি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল, তারাও এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে কাতার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘বুকে পাথর রেখে এই কথা’ বারুইপুর এনকাউন্টারের পর অভিযুক্তের মাকে নিয়ে যা বললেন রত্না দেবনাথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ রুটগুলির অন্যতম। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে আমেরিকার কঠোর অবস্থান, ইরানের (Iran) পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং কাতারসহ আঞ্চলিক দেশগুলির উদ্বেগ, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকলেও নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মহলের আশা, উত্তেজনা আরও না বাড়িয়ে সব পক্ষ আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খুঁজবে, কারণ হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা শুধু পশ্চিম এশিয়ার নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।













