বাংলাহান্ট ডেস্ক: গুজরাটের অনল কোটাকের জীবনের সাফল্যের (Success Story) কাহিনি যেন এক অনুপ্রেরণার উপন্যাস। রক্ষণশীল ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি প্রচলিত সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার পথে হাঁটেননি। পরিবারের ইচ্ছা ছিল তিনি ইউপিএসসি, সিএ বা সিএসের মতো পেশায় প্রতিষ্ঠিত হোন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাঁর মন পড়ে ছিল রান্না ও হোটেল ব্যবস্থাপনার জগতে। সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা এসেছিল বারবার। তবে নিজের লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে যাননি অনল। আজ তিনি আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ ব্র্যান্ড ‘দ্য সিক্রেট কিচেন’-এর প্রতিষ্ঠাতা, পরিচিত সেলিব্রিটি শেফ এবং সফল উদ্যোক্তা। তাঁর সাফল্যের সফর প্রমাণ করে যে দৃঢ় সংকল্প ও অধ্যবসায় থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিকেও জয় করা সম্ভব।
অনল কোটাকের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
অনলের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় শুরু হয় মাত্র ২০ বছর বয়সে। তখন তাঁর বাগদানের অনুষ্ঠান চলছিল। পরিবারের অজান্তে এবং মাসির সহায়তায় ভোর ৪টায় তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান একটি টেলিভিশন কুকিং শো-এর অডিশন দিতে। সেই অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘রসই মহারানি’। অনেকের কাছে বিষয়টি ছিল দুঃসাহসিক, কিন্তু অনলের কাছে সেটাই ছিল নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার প্রথম বড় পদক্ষেপ। অডিশনে অংশ নেওয়ার পর তিনি শুধু নির্বাচিতই হননি, শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতাটিও জিতে নেন। সেই সাফল্য তাঁকে গুজরাটের সর্বকনিষ্ঠ রান্না বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয় এবং তাঁর পেশাগত জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
আরও পড়ুন: অনুপ্রবেশ রোধে জোর! দিল্লিতে বৈঠকে বসছে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত বাহিনী
রান্নার প্রতি অনলের ভালোবাসার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। তিনি তাঁর দিদিমা ও পরদিদিমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা বলে মনে করেন। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন, রান্না শুধু শিল্প নয়, এটি একটি বিজ্ঞান এবং প্রতিদিনের অনুশীলনের বিষয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে রাম নবমীর একটি অনুষ্ঠানে নির্ধারিত ক্যাটারার না আসায় তিনি দিদিমার তত্ত্বাবধানে প্রায় ৫০ জনের জন্য রান্না করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে তিনি ব্যবসার খুঁটিনাটি শিখেছেন পরিবার থেকেই। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার আগে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা জরুরি। সেই কারণে দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি পেশাদার রান্নার জগতের সূক্ষ্ম বিষয়গুলি আয়ত্ত করেন।
টেলিভিশন শোতে সাফল্য (Success Story) পাওয়ার পর এবং বিবাহের পরে পরিবারের সমর্থনও ধীরে ধীরে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়। তিনি বেঙ্গালুরু ও মুম্বাইয়ে পেশাদার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পরে অস্ট্রেলিয়া থেকে দূরশিক্ষার মাধ্যমে রন্ধনশিল্পে ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৭ সালে ভাদোদরায় প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর প্রথম রেস্তোরাঁ ‘দ্য সিক্রেট কিচেন’। রেস্তোরাঁর প্রতিটি বিষয় তিনি নিজে তদারকি করেছিলেন। এমনকি অভ্যন্তরীণ সজ্জা এবং বিশেষ বাসনপত্র নির্বাচন করার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে ২০ দিন চিনে কাটিয়েছিলেন। তাঁর রেস্তোরাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের হারিয়ে যেতে বসা আঞ্চলিক খাবারকে আধুনিক রূপে পরিবেশন করা। ঠাকুমার রেসিপি থেকে তৈরি ‘মুগ ঢোকলা’ এবং অভিনব ‘কেজ সামোসা’ দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
আজ অনল কোটাকের ‘দ্য সিক্রেট কিচেন’ ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া মিলিয়ে ১১টি আউটলেট পরিচালনা করছে। প্রতি মাসে প্রায় ৮১ হাজারেরও বেশি অর্ডার সরবরাহ করা হয় এই ব্র্যান্ডের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে তিনি এক অভিনব পদ্ধতি চালু করেছেন, যেখানে তাঁর ঠাকুমার ঐতিহ্যবাহী আচার তৈরির কৌশল অনুসরণ করে প্রিজারভেটিভবিহীন গ্রেভির বেস প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত বেস গ্রেভির প্রায় ৮০ শতাংশ ভারতে তৈরি হয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এর ফলে বিভিন্ন দেশে একই স্বাদ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ‘অভিষেকের নিজের..’, হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক সদ্য TMC ছেড়ে যাওয়া এই ‘হেভিওয়েট’ নেতা!
সেলিব্রিটি শেফ হিসেবেও অনল কোটাকের পরিচিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জনপ্রিয় কুকিং রিয়্যালিটি শো ‘মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’-র সপ্তম সিজনে অতিথি বিচারক হিসেবেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভারতীয় খাবারকে বিশ্বদরবারে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়েছেন। শিকাগোয় নতুন আউটলেট খোলা, রেডি-টু-কুক মশলার এফএমসিজি ব্র্যান্ড সম্প্রসারণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী স্বাদকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। একসময় যে তরুণী নিজের স্বপ্নের জন্য বাগদানের আসর ছেড়ে ভোররাতে অডিশনে ছুটে গিয়েছিলেন, আজ সেই অনল কোটাকই হাজারও তরুণ উদ্যোক্তার কাছে সাহস, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছেন (Success Story)।













