দেশ গঠনে সাহায্য করেন গৃহিণীরা! তাঁদের বেতন হওয়া উচিত মাসিক ৩০,০০০ টাকা, কী জানাল সুপ্রিম কোর্ট?

Published on:

Published on:

Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: দেশের লক্ষ লক্ষ গৃহবধূ ও ‘হোমমেকার’-দের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সংসার সামলানো কোনও সাধারণ কাজ নয় এবং ‘হোমমেকার’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদানকে খাটো করে দেখায়। আদালতের মতে, একজন গৃহবধূ শুধু পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্মই পরিচালনা করেন না, তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, পরিবারের ভিতকে শক্তিশালী করেন এবং পরোক্ষভাবে দেশ গঠনের কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাঁদের কেবল ‘হোমমেকার’ নয়, বরং ‘দেশের নির্মাতা’ হিসেবেও দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

গৃহিণীদের মাসিক বেতন কত হওয়া উচিত জানাল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)

ঘটনার সূত্রপাত ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে পঞ্জাবে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা থেকে। ওই দুর্ঘটনায় এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবার ক্ষতিপূরণের দাবিতে মোটর অ্যাকসিডেন্ট ক্লেম ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হলে প্রথমে ২.৪২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ৮.৪ লক্ষ টাকা করে। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে পরিবার সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) দ্বারস্থ হয়। মামলার শুনানি শেষে বিচারপতি সঞ্জয় করোলের বেঞ্চ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে ৬২.৭৮ লক্ষ টাকা প্রদানের নির্দেশ দেয় এবং বিমা সংস্থাকে সেই অর্থ পরিশোধ করতে বলে।

আরও পড়ুন: ওমান উপসাগরে বাণিজ্যতরীতে মার্কিন হামলা! মৃত্যু ৩ ভারতীয় নাগরিকের, তীব্র নিন্দা জানাল নয়াদিল্লি

এই মামলার শুনানিতেই গৃহবধূদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবদান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি করোল বলেন, সংসার পরিচালনা, সন্তানদের প্রতিপালন, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া এবং একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করার মতো কাজের অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। আদালতের মতে, একজন গৃহবধূর শ্রমকে কেবল গৃহস্থালির কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না, কারণ তাঁর অবদান পরিবারের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিচারপতির মন্তব্য, “হোমমেকার না বলে তাঁদের দেশের নির্মাতা বলা উচিত।” আদালত আরও জানায়, দীর্ঘদিন ধরে মহিলাদের এই অবৈতনিক শ্রমকে সমাজ যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।

বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়েও সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “বিয়ে মানে কোনও পরিচারিকা নিয়োগ নয়।” সংসারের দায়িত্ব শুধুমাত্র স্ত্রীর নয়, স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সমানভাবে। আদালত জানায়, কোনও মহিলা বিবাহিত বলেই তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা, পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকার খর্ব করা যায় না। সন্তানদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি যদি কোনও মহিলা নিজের কর্মজীবনে সফল হতে চান, তবে সেটিকে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির প্রতি অবহেলা বা নির্মমতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণই হওয়া উচিত আদর্শ।

Supreme Court of India preferred to name homemakers as Nation builder

আরও পড়ুন: নেহরুর রেকর্ড ভেঙে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী থাকার নজির গড়লেন মোদী! বিশ্বমঞ্চে শুভেচ্ছার বন্যা

মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) মোটর দুর্ঘটনায় নিহত গৃহবধূদের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে। আদালতের মতে, পরিবারের জন্য একজন গৃহবধূ যে সেবা ও শ্রম প্রদান করেন, তার ন্যূনতম মাসিক অর্থনৈতিক মূল্য ৩০ হাজার টাকা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিচারপতি করোল বলেন, “হোমমেকাররা দেশ গঠন করেন। তাঁদের কাজের মূল্য অস্বীকার করা যায় না।” পাশাপাশি দেশের সমস্ত হাই কোর্টকে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের আর্থিক সহায়তার মামলাগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি করার নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের কোটি কোটি গৃহবধূর অবদানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।